ভাষার জন্য আন্দোলন: দেশে দেশে

বাঙালির মাতৃভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার রক্তাক্ত দিন ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি। ঢাকার রাজপথে বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়ে বাংলার মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করেছেন রফিক-সালাম-বরকতরা। তাঁদের ত্যাগের বিনিময়েই ১৯৫৬ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি (৪ ফাল্গুন, ১৩৬২ বঙ্গাব্দ) উর্দুর সংগে বাংলাকেও রাষ্ট্রভাষা ঘোষণা করতে বাধ্য হয় তৎকালীন পাকিস্তান সরকার।

পৃথিবীর ইতিহাসে এ এক অনন্য ঘটনা। একুশে ফেব্রুয়ারি এখন দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক দিবসে পরিণত হয়েছে। ১৯৯৯ সালে ২১ ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করেছে জাতিসংঘ। এখন পৃথিবীজুড়ে দিবসটি পালিত হয়।

১৯৫২ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজের সামনে আন্দোলনকারীরা

‘ভাষার জন্য আন্দোলন’ কিংবা ‘আন্দোলনের অন্যতম উপলক্ষ ভাষা’- এমন অধিকার আদায়ের আন্দোলন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে হয়েছে। এই আন্দোলন কোথাও অহিংস থেকেছে, কোথাও সহিংস হয়ে উঠেছে। আবার কোনো কোনো স্বাধীন দেশেও অঞ্চলভেদে বিভিন্ন ভাষার জনগোষ্ঠী তাঁদের মাতৃভাষার জন্য লড়াই করেছে, কোথাও কোথাও এখনো চলমান।

ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, লাটভিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকাসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ভাষার দাবিতে আন্দোলন-সংগ্রাম হয়েছে। প্রতিবেশী দেশ ভারতে বিভিন্ন রাজ্যে ভাষার মর্যাদা রক্ষার দাবি উঠেছে। ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও ক্ষমতাসীন বিজেপির সভাপতি অমিত শাহ হিন্দিকে ভারতের জাতীয় ভাষা করার ইংগিত দিলে সেই দেশের বিভিন্ন রাজ্য থেকে তীব্র প্রতিবাদও পরিলক্ষিত হয়েছে। অবশ্য পরে অমিত শাহ তাঁর বক্তব্য অস্বীকার করেছেন।

ভাষার দাবিতে ভারতে সবচেয়ে বড় আন্দোলন হয় ১৯৬৫ সালে, যখন হিন্দিকে একমাত্র সরকারি ভাষা করা হয়। ১৯৬৫ সালের ২৬ জানুয়ারি এই আন্দোলনের সূচনা হয়; যা এক পর্যায়ে তীব্র আন্দোলনে রূপ নেয়, দলে দলে মানুষ রাজপথে নেমে আসে। প্রায় দু’মাস ধরে সহিংসতা চলে দক্ষিণাঞ্চলে, বিশেষ করে মাদ্রাজে। শেষ পর্যন্ত ১৯৬৭ সালে হিন্দির সংগে ইংরেজিকেও ব্যবহারিক সরকারি ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।

এখন পর্যন্ত ভারতে ২২টি ভাষা সরকারের তালিকাভুক্ত রয়েছে এবং চারটি ভাষা ঐতিহ্যবাহী ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। যদিও ভারতে মোট ভাষার সংখ্যা শ’খানেক বা কিছু বেশি। কেন্দ্রীয়ভাবে দেশটির দাপ্তরিক ভাষা হিন্দি এবং ইংরেজি।

ভাষার প্রশ্নে আসামে আন্দোলন হয়েছিলো ১৯৬১ সালে। তৎকালীন প্রাদেশিক সরকার কেবল অহমীয় ভাষাকে আসামের একমাত্র সরকারি ভাষা করার সিদ্ধান্ত নিলে আন্দোলনটি দানা বাঁধে। পরে অবশ্য বাংলাকেও স্বীকৃতি দেয় প্রাদেশিক সরকার।

আসামের ভাষা আন্দোলনে প্রাণোৎসর্গকারীরা

দক্ষিণ আফ্রিকায় ভাষার জন্য আন্দোলন করেছিলো স্কুলছাত্ররা। ১৯৭৬ সালের জুন ১৬ স্কুলের কিশোররা প্রতিবাদ জানাতে রাস্তায় নেমে আসে। যুক্তরাষ্ট্রে নেটিভ আমেরিকানরা বারবার তাদের ভাষা রক্ষায় আন্দোলন করেছে। গত শতকের ষাট-সত্তরের দশকে নাগরিক অধিকার আন্দোলনের সময় এই আন্দোলন গতি পায়। কানাডায়, বিশেষত কানাডার পূর্ব অংশের অঙ্গরাজ্য কুইবেকে ভাষার স্বাধীনতা চেয়ে আন্দোলন হয়েছে বেশ কয়েকবার। লাটভিয়ায় গণভোটে লাটভিয়ানরা কয়েকশ’ বছরের প্রধান ভাষা রুশকে সরকারি ভাষা করার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে।

দক্ষিণ ভারতে প্রথম প্রতিবাদ ১৯৩৭ সালে

দক্ষিণ ভারতে ভাষার জন্য প্রথম রাজনৈতিক প্রতিবাদ হয় ১৯৩৭ সালে। তৎকালীন ব্রিটিশ রাজের মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সির স্থানীয় ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেস সরকার স্কুলে হিন্দি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করলে এই আন্দোলন শুরু হয়। তিন বছরব্যাপী এই আন্দোলন অনশন, সভা-সমাবেশ, পদযাত্রা, পিকেটিং ও সহিংস প্রতিবাদ পর্যন্ত গড়ায়। কঠোর হস্তে আন্দোলন দমনের কৌশল নেয় সরকার। এতে দু’জন প্রাণ হারান এবং নারী-শিশুসহ এক হাজার ১৯৮ জনকে গ্রেফতার করা হয়। ১৯৩৯ সালে কংগ্রেস সরকার পদত্যাগের পর ১৯৪০ সালে তৎকালীন মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সির ব্রিটিশ গভর্নরের হস্তক্ষেপে বাধ্যতামূলক হিন্দি শিক্ষার আইন প্রত্যাহার করা হয়। এতে ভারতীয় কেন্দ্রীয় কংগ্রেস সরকার নাখোশ হলেও স্থানীয় আন্দোলন শেষ হয়।

ভারতের মাদ্রাজে হিন্দিবিরোধী বিক্ষোভ

এর চেয়ে বড় আন্দোলন হয় ১৯৬৫ সালে, যখন হিন্দিকে একমাত্র সরকারি ভাষা করা হয়। সে বছর, ২৬ জানুয়ারি এর বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন শুরু হয়, মানুষ রাস্তায় নেমে আসে দলে দলে। প্রায় দুইমাস যাবত দাঙ্গা হয় দক্ষিণে, বিশেষ করে মাদ্রাজে। শতাধিক লোকের মৃত্যু হয়। সারা দক্ষিণ ভারত বিশেষভাবে তামিলনাড়ু উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এর প্রতিবাদে আত্মাহুতির ঘটনাও ঘটে। ১৯৬৭ তামিলনাড়ুর বিধানসভা নির্বাচনে আন্দোলনের পক্ষাবলম্বনকারী রাজনৈতিক দলগুলো বিজয়ী হয়। এর ফলে তামিলনাড়ুতে ডিএমকে ক্ষমতায় আসে এবং কংগ্রেস প্রায় অদৃশ্য হয়ে যায়- এমনটিই ধারণা করা হয়। শেষ পর্যন্ত ১৯৬৭ সালে হিন্দির সঙ্গে ইংরেজিকেও ব্যবহারিক সরকারি ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়। পঁয়ষট্টির আন্দোলনের মূল কেন্দ্র ছিলো তামিলনাড়ু রাজ্যের মাদ্রাজ (বর্তমান চেন্নাই)। অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বিশেষ করে মাদ্রাজ এবং আন্নামালয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরা এই আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

ভাষাভিত্তিক শক্তিশালী সাংস্কৃতিক ঐহিত্যের গর্ব ভারতের অন্য রাজ্যেও কম নয়। এর মধ্যে ওড়িশা, কর্নাটক, পশ্চিমবঙ্গ, পাঞ্জাব এবং মহারাষ্ট্র অন্যতম। কেন্দ্রীয় সরকারের হিন্দি চাপানোর স্পষ্ট প্রতিবাদ হিসেবে মহারাষ্ট্র সরকার স্থানীয় বিভিন্ন ভাষাকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বাধ্যতামূলক করেছে।

দক্ষিণ আফ্রিকা: ১৬ জুন, ১৯৭৬

দক্ষিণ আফ্রিকায় ভাষা আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয় স্কুল পর্যায়ের ছাত্ররা। গাউটাংয়ের (তৎকালীন ট্রান্সভাল প্রদেশ) জোহানেসবার্গ শহরের সোয়েটোতে সংঘটিত আন্দোলনটি হয়েছিলো ১৯৭৬ সালের ১৬ জুন । আঞ্চলিক কর্তৃপক্ষ আফ্রিকানার ভাষায় (দক্ষিণ আফ্রিকায় বসবাসরত শ্বেতাঙ্গ ডাচদের জার্মান-ডাচ ভাষার মিশ্রণ) শিক্ষাদান স্কুলে বাধ্যতামূলক করলে শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদে রাস্তায় নেমে আসে। তারা মাতৃভাষা জুলু এবং ব্যবহারিক লিঙ্গুয়া ফ্রাঙ্কা ইংরেজিতে শিক্ষা নিতে বেশি আগ্রহী ছিলো। এর প্রেক্ষিতে প্রতিবাদ সভা ডাকা হয়। এই ঘটনাকে বলা হয় সুয়েটো অভ্যুত্থান এবং ট্র্যাজেডির দিনটিকে বলা হয় ‘ডে অব চাইল্ড’।

ভাষার দাবিতে আফ্রিকার শিশুদের আত্মবলিদান

তৎকালীন বর্ণবাদী সরকার প্রতিবাদ সভায় যোগ দিতে যাওয়া ছাত্রদের মিছিলে গুলি করে। শতাধিক মানুষ নিহত হয়। বেশিরভাগই ছিলো শিশু-কিশোর। দক্ষিণ আফ্রিকায় দিনটিকে বিশেষ মর্যাদায় পালন করা হয়।

যুক্তরাষ্ট্র: কমছে ইংরেজির আধিপত্য

যুক্তরাষ্ট্রে অনেক নেটিভ আমেরিকান ভাষা ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শাসকদের হাতে মৃত্যুবরণ করেছে। গত শতকের ষাট-সত্তরের দশকে নাগরিক অধিকার আন্দোলনের সময় এই নেটিভ আমেরিকান ভাষা রক্ষার দাবিও সামনে চলে আসে। মূল প্রস্তাবনার আলোকে দীর্ঘ ২০ বছর আন্দোলন এবং আলোচনার পর ১৯৯০ সালের ৩০ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন নেটিভ/আদি/স্থানীয় ভাষা রক্ষা এবং সংরক্ষণের জন্য একটি আইন পাস হয়। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক অঙ্গরাজ্যে ইংরেজির আধিপত্য কমেছে। ক্রমেই সংখ্যালঘুদের ভাষায় পরিণত হচ্ছে এটি। সে স্থলে উঠে আসছে স্প্যানিশ বা অন্য কোনো ভাষা।

কানাডা: ভাষার আন্দোলনের তীব্রতা ক্ষয়ে গেছে

কানাডায়, বিশেষত কানাডার পূর্ব অংশের অঙ্গরাজ্য কুইবেকের রাজনীতিতে ভাষা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। এই অঞ্চল এক সময় সংস্কৃতি এবং ভাষার প্রশ্নে স্বাধীনতা চেয়েছিলো। অবশ্য সেই আন্দোলনের তীব্রতা ক্রমেই ক্ষয়ে গেছে।

লাটভিয়া: গণভোটে প্রত্যাখ্যান

ভাষার প্রশ্নে চরম জাতীয়তাবাদের স্বরূপ দেখিয়েছে লাটভিয়ানরা। রুশ ভাষাকে দ্বিতীয় দাপ্তরিক ভাষা করার প্রশ্নে ২০১২ সালে লাটভিয়ায় গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। গণভোটে স্পষ্ট ব্যবধানে রুশ ভাষাকে প্রত্যাখ্যান করেন লাটভিয়ানরা। যদিও রুশ সাম্রাজ্য এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের অংশ থাকাকালে কয়েকশ’ বছর ধরে রুশ ভাষাই ছিলো লাটভিয়ার প্রধান ভাষা।

অধিকার আদায়ের আন্দোলনে ভাষার দাবি

প্রেক্ষাপট ভিন্ন হলেও নানান অধিকার আদায়ের আন্দোলনে অন্যতম নিমিত্ত হয়ে উঠেছে ভাষা। বেলজিয়ামে ফ্রেঞ্চ-জার্মান-ডাচ, ইউরোপের বলকান অঞ্চল, স্পেনের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য, আফ্রিকার গোল্ড কোস্ট অঞ্চল; উনিশ শতকে গোটা মধ্যপ্রাচ্য আরবি-ফারসি-তুর্কি কিংবা তৎকালীন মেক্সিকোর উত্তরাংশে স্প্যানিশ-ইংরেজি; সপ্তদশ-অষ্টদশ শতকে চীনে ম্যান্ডারিন-মাঞ্চুরিয়ান বিরোধ ইত্যাদি নানানভাবে নানানরূপে জাতীয়তাবাদী স্বাধিকার ও সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য রক্ষার আন্দোলনে উপলক্ষ হয়ে উঠেছে ভাষা।

সূত্র: বিবিসি এবং উইকিপিডিয়া, বণিক বার্তা।

You may also like

স্বাধীনতা পুরস্কার পাচ্ছে নয় বিশিষ্টজন ও এক প্রতিষ্ঠান

দেশের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পুরস্কার এবারের স্বাধীনতা পুরস্কার পাচ্ছেন