মাধ্যমিকের অর্ধেকের বেশি প্রতিষ্ঠানেই নেই শহীদ মিনার!

অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই অস্থায়ী শহীদ মিনার হয় শহীদ দিবসে

‘শুভ ইসলাম’

শহীদ মিনার, ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিসৌধ। ৫২’র ভাষা আন্দোলনে বাংলা ভাষার জন্য আত্মোৎসর্গ করেছিলেন যারা, তাদের স্মরণে নির্মিত হয় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার। যেকোনো স্মৃতিস্তম্ভের মাধ্যমে ইতিহাস-ঐতিহ্যকে যেমন হৃদয়ে লালন করা অনেক সহজ হয়ে ওঠে, তেমনি নতুন প্রজন্মও জানতে পারে নিজের ইতিহাস।

ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্ররা ১৯৫২ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি বিকেলে অতিদ্রুত এবং অপরিকল্পিতভাবে প্রথম শহীদ মিনার নির্মাণ করেছিল। শহীদ মিনারের ছবি খবর কাগজে পাঠানো হয় ঐ দিনই। শহীদ বীরের স্মৃতিতে – এই শিরোনামে দৈনিক আজাদ পত্রিকায় ছাপা হয় শহীদ মিনারের খবর।

ছবি: ঢাকায় নির্মিত প্রথম শহীদ মিনার

স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে আমরা দেখতে পাই দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভাষা শহীদদের স্মরণে, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের আদলে তৈরি হয় স্মৃতির মিনার। এই ধারাকে অব্যাহত রাখতে সরকারীভাবেও বিভিন্ন সময় ঘোষণা আসে- প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শহীদ মিনার নির্মাণ করতে হবে। এজন্য সরকার সহায়তা দিতেও উদ্যোগী। দৃশ্যতঃ এর বাস্তবায়ন নেই অনেক শিক্ষালয়েই।

বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো-ব্যানবেইস’র তথ্যে দেখা যায়, দেশের মাত্র ২৩ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে রয়েছে শহীদ মিনার। আর মাধ্যমিকের ৫০ শতাংশ প্রতিষ্ঠানেই নেই এই স্মৃতিস্তম্ভটি। অন্যদিকে, মাদ্রাসাতে গিয়ে এ সংখ্যা তলানিতেই বলা চলে।

ছবি: স্কুল প্রাঙ্গনে নির্মিত শহীদ মিনার

প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শহীদ মিনারের সংখ্যা নিয়ে বাংলাভিশন অনলাইনকে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) ড. মো নুরুল আমিন চৌধুরী জানান, “দেশে ৬৫ হাজারেরও অধিক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ২৩ হাজার প্রাথমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শহিদ মিনার নির্মাণ করা হয়েছে। মুজিব বর্ষ উপলক্ষে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শহীদ মিনার নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর থেকে মূল কাঠামো ঠিক রেখে একটি ইউনিক ডিজাইন করার জন্য এলজিইডিকে চিঠি ইস্যু করা হয়েছে। পরবর্তীতে এলজিইডি প্রদত্ত ডিজাইন অনুযায়ী পর্যায়ক্রমে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শহীদ মিনার নির্মাণ শুরু করা হবে”।

ব্যানবেইসের প্রধান পরিসংখ্যানবিদ শেখ মোহাম্মদ আলমগীরের দেয়া তথ্যানুযায়ী, দেশে স্কুল, স্কুল অ্যান্ড কলেজ এবং টেকনিক্যাল কলেজে (ইআইএনভুক্ত) ৫০ শতাংশের বেশি স্কুল অ্যান্ড কলেজে শহীদ মিনার ইতিমধ্যে নির্মাণ করা হয়েছে।

বাকিগুলোতে শহীদ মিনার নির্মাণে কি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে এ বিষয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের পরিচালক বেলাল হোসেন জানান, শহীদ মিনার নির্মাণ ৫২’র পরপরই শুরু হয়েছে, কিন্তু তারপরও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শহীদ মিনার কম নির্মাণ হওয়ায় তিনি মর্মাহত। ডিজি’র সাথে কথা বলে এ বিষয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।

ব্যানবেইস বলছে, দেশে ৯ হাজার ২শ’ ৯৫টি মোট মাদরাসার মধ্যে এক হাজার একশ’ ৫০ টিতে শহীদ মিনার তৈরি করা হয়েছে। যা দেশের অন্যান্য স্কুল-কলেজের শহীদ মিনার নির্মাণের তুলনায় অনেক কম।

ছবি: দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নির্মিত শহীদ মিনার

মাদরাসায় শহীদ মিনারের সংখ্যা কেন এতো কম? এ বিষয়ে মাদারাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক (অর্থ) মোহাম্মদ আবদুল মুকীত টেলিফোনে জানান, “বেসরকারী কোন মাদরাসায় শহীদ মিনার নির্মাণের জন্য কোন বরাদ্দ দেয়া হয় না। তবে, সরকারি নিয়ম অনুযায়ী সকল মাদরাসায় সরকারী দিবস পালনের জন্য নির্দেশনা দেয়া হয়”।

প্রশ্ন উঠতেই পারে, যদি নিজস্ব তহবিল থেকেই মাদরাসায় শহীদ মিনার নির্মাণ করতে হয় ,তাহলে সংশ্লিষ্ট মাদরাসাগুলো করছে না কেন? অর্থ সংকট নাকি ইসলামী মূল্যেবোধ বা ধর্মীয় অনুভুতিতে শহীদ মিনার আঘাত হানতে পারে! এ ধারণা থেকেই কি ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শহীদ মিনার কম নির্মাণ করা হয়? এরকম প্রশ্নের উত্তর দিতে নারাজ ইসলামিক ফাউন্ডেশনের (গবেষণা বিভাগ) মুফাসসির, বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ ড. মাওলানা মোহাম্মদ আবু সালেহ পাটোয়ারী।

তবে তামিরুল মিল্লাত কামিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ ড. আবু ইউসুফ খান বলেন, “আসলে ধর্মীয় দৃষ্টিকোণের কোন ব্যাপার না। মূল বিষয় হলো, নতুন প্রজন্মকে ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস জানানোর জন্য সরকারি বিধি মোতাবেক শহীদ মিনার নির্মাণ করা দরকার”।

ভাষা আন্দোলনের ৬৯ বছর পরে এসে বর্তমান প্রেক্ষিতে প্রশ্ন জাগে- বাঙালি জাতি কতটুকু আত্মস্থ করতে পেরেছে বাংলাকে? পেরেছে কি বাংলা ভাষা ও ভাষা আন্দোলনকে হৃদয়ে লালন করতে? এখনও প্রতিনিয়ত ইংরেজি, ফরাসিসহ বিদেশি ভাষার আগ্রাসন লক্ষ্যণীয়। উন্নত জীবনের হাতছানিতে বিদেশি ভাষা গ্রাস করছে তরুণ সমাজকে।

ভাষাবিদরা বলছেন, মাতৃভাষার সঠিক ইতিহাসকে স্কুল-কলেজ থেকেই শিক্ষার্থীদের মন-মননে প্রবেশ করানোর একটি মাধ্যম হল প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শহীদ মিনার তৈরি করা।

ভাষাসৈনিক ও শিক্ষাবিদরা বলছেন, শিক্ষার্থীদের ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস সম্পর্কে জানতে ও এর তাৎপর্য সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা দিতে বিদ্যালয়গুলোতে শহীদ মিনার নির্মান আবশ্যক।

২০২০ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত ডেইলি স্টারে এক সাক্ষাৎকারে ভাষাসৈনিক আহমদ রফিক বলেছিলেন, “সারাদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো ছিল ভাষা আন্দোলনের সূতিকাগার। সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একটি করে শহীদ মিনার থাকা উচিত।” তার মতে, “এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস সম্পর্কে জানতে পারবে। শহীদদের উদ্দেশ্যে নির্মিত স্মৃতিসৌধ শৈশব থেকেই তাদের দেশপ্রেমের চেতনায় উদ্বুদ্ধ করবে।”

ছবি: ভাষাসৈনিক আহমদ রফিক

প্রাণের দামে ভাষার স্বীকৃতি আদায় করা জাতিই যদি ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস সঠিকভাবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে লালন করতে না পারে, তাহলে এর চেয়ে লজ্জার আর কি থাকতে পারে? এ লজ্জা থেকে বাঁচতে শিকড় থেকেই বাংলা ভাষার প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি করা আবশ্যক। এরজন্য কোমলমতি শিক্ষার্থীদের হৃদয়ে ভাষার মমত্ববোধের বীজ বপন করতে হবে প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকেই। আর এর প্রধান উপকরণ হবে শহীদ মিনার। প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শহীদ মিনার থাকাটা এখন সময়ের দাবি।

বিভি/এইচএস/এনজি

You may also like

স্বাধীনতা পুরস্কার পাচ্ছে নয় বিশিষ্টজন ও এক প্রতিষ্ঠান

দেশের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পুরস্কার এবারের স্বাধীনতা পুরস্কার পাচ্ছেন