ভাষা মতিনের চোখে আলো ঝলমল পৃথিবী রেশমা’র

ছবি: ভাষা মতিন এবং রেশমা

‘হাসান ওয়ালী’

ছোটবেলা থেকেই বাম চোখে কম দেখতেন ধামরাইয়ের রেশমা নাসরীন। ২০১৩ সালের এক সন্ধ্যায় হঠাৎ গাঢ় আঁধার নেমে আসে তাঁর চারদিকে। পৃথিবীকে অচেনা মনে হয় রেশমা’র। দৌড়ঝাঁপ শুরু করেন বিভিন্ন হাসপাতালে। সবশেষে ঠিক হয়, ভারতের হায়দারাবাদে কর্ণিয়া স্থাপন করাতে যাবেন। চিকিৎসা ব্যয় আনুমানিক পাঁচ লাখ টাকা। কিন্তু একটি নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের পক্ষে এতো টাকা যোগাড় করা তো সহজ কথা নয়! তাই দিন পেছাতে থাকে। ফিকে হতে থাকে রেশমা’র চোখে আলো ফেরানোর স্বপ্ন। 

অবশেষে অনেক আশা-নিরাশার পর ২০১৪ সালের ০৮ অক্টোবর ভাষা সৈনিক আব্দুল মতিনের মৃত্যু আলোর দুয়ার খুলে দেয় রেশমা’র সামনে। ঠিক হয়, মহান ভাষা সংগ্রামীর দান করা চোখ প্রতিস্থাপিত হবে রেশমা’র চোখে এবং স্বদেশেই আয়োজন হবে এই মহতি উদ্যোগের।

০৯ অক্টোবর ঢাকার সন্ধানী চক্ষু হাসপাতালে ভাষা সৈনিক আব্দুল মতিনের চোখের কর্ণিয়া স্থাপিত হয় রেশমা’র চোখে। ফলে ১০ অক্টোবরের সূর্যটা সত্যি সত্যি রেশমা’র চোখের আঁধার সরিয়ে আলোর সুষমায় পরিপূর্ণ করে দেয়। এদিনের সকালটা ছিলো ভীষণ উদ্দীপনার; আত্মতৃপ্তির, এমনকি গৌরবের। ‘এক চোখে যে মানুষ দেখতেই পায় না, সেই চোখে আলো ঝলমল পৃথিবী দেখা, এ এক অন্যরকম অনুভূতি। বলে বুঝানো যাবে না। অনেক আনন্দ লাগছে। বিশেষ করে, একজন মহান ব্যক্তির চোখে দুনিয়া দেখছি বলে নিজের সৌভাগ্যে নিজেই বিস্মত হই। সবসময় তাঁর কথা ভাবি। তাঁর জন্য দোয়া করি।’ বলছিলেন রেশমা।

বছরের ০৮ অক্টোবর মহান এই ব্যক্তিত্বের মৃত্যুবার্ষিকীতে দোয়া মাহফিলের আয়োজন করেন রেশমা। বর্তমানে কাজ করছেন স্বাস্থ্যকর্মী হিসেবে। ঢাকার ধামরাইয়ের সুয়াপুর ইউনিয়নের কমিউনিটি ক্লিনিকের হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার রেশমা গ্রামের সাধারণ মানুষের সেবা করছেন মন দিয়েই। মরণোত্তর দেহ দান নিয়ে যে ভীতি রয়েছে সাধারণের মাঝে, তা দূর করার চেষ্টা করে চলেছেন।

ছবি: পরিবারের সদস্যদের সাথে রেশমা নাসরীন

ব্যক্তি জীবনে দুই সন্তানের মা রেশমা নিয়ম করে সন্তানদের শোনান মহান ব্যক্তিত্বদের জীবনের গল্প। বিশেষ করে, ভাষা সৈনিক আব্দুল মতিনের মহান ত্যাগের কথা, ভাষা আন্দোলনে তাঁর বীরত্বগাঁথা ও অবদানের গল্প। রেশমা’র বাবা আব্দুল বারেক বীর মুক্তিযোদ্ধা। তিনিও নাতিদের উদারতা এবং ত্যাগের শিক্ষা দেন। রেশমা বলেন, ‘বাচ্চাদের ওভাবেই মানুষ করছি। ওরাও যেন মানুষের উপকারে আসতে পারে। ওরা যদিও ছোট, তারপরও ভাষা সৈনিক আব্দুল মতিনসহ অন্য ভাষা সৈনিকদের কথা জানে। আমার বাবা মুক্তিযোদ্ধা, তিনিও সবসময় ইতিহাস জানান। তাঁদের জীবন বিলিয়ে দেওয়ার গল্প শোনান।’

শুধু চোখের আলোয় ভেসে যাওয়া নয়, ভাষা সৈনিক আব্দুল মতিনের আদর্শও ধারণ করতে চান রেশমা। তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, মরণোত্তর চক্ষু দান করবেন। বলেন, ‘আগে ভাবতাম চোখ দান করা ভালো নয়, তাঁর (ভাষা মতিন) চোখ দিয়ে পৃথিবী দেখে আমিও অনুপ্রাণিত হচ্ছি। একজনের দান করা চোখে আরেকজন যদি দুনিয়ার আলো দেখতে পারে, তার চেয়ে ভালো কিছু হতেই পারে না। আমার ডান চোখটা যদি ভালো থাকে, ইন শা আল্লাহ আমি দান করে যাবো।’

ভাষা আন্দোলন নিয়ে আলোচনা হলেই নাম আসে আব্দুল মতিনের। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবস্থায় ভাষা আন্দোলনে সম্পৃক্ত হন তিনি। রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক হিসেবে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখেন বায়ান্ন’র ভাষা আন্দোলনে। সুফল হিসেবে বাঙালি পায় মায়ের ভাষায় কথা বলার অধিকার। এর পর থেকেই তিনি ‘ভাষা মতিন’ নামে সাধারণের কাছে পরিচিত হয়ে ওঠেন। জীবনভর মানুষের অধিকার রক্ষার সংগ্রামে লিপ্ত ছিলেন আবদুল মতিন। ২০১৪ সালের ০৮ অক্টোবর ঢাকার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই মহান ভাষা সংগ্রামী। তাঁর দান করা দু’চোখে রেশমা’র সংগে পৃথিবী দেখছেন সাতক্ষীরার কলেজ শিক্ষক ইকবাল কবিরও।

বিভি/এইচডব্লিউ/ইই/এমএইচকে

You may also like

করোনায় ৭ জনের মৃত্যু, নতুন শনাক্ত ৬১৯ জন

করোনাভাইরাসের সংক্রমণে ২৪ ঘণ্টায় দেশে আরও সাত জন