আমানি খু আংনি রাসং’

‘হাসান ওয়ালী’

‘আমার মাতৃভাষায় কথা বলতে যেয়ে অনেক সময় তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের শিকার হই। ক্যাম্পাস লাইফে বলি, কিংবা রাস্তাঘাটেই বলি… এ সমস্যাগুলোতে আমি পড়েছি। যে দেশে ভাষার জন্য আন্দোলন হলো, সে দেশে আরেকটা জাতিকে, সম্প্রদায়কে, ভাষাকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা দেখে হতবাক হয়ে যাই। আমরা কেন আমাদের মতো করে মাতৃভাষায় কথা বলতে পারছি না। বললেই আরেকজন কেন ব্যঙ্গবিদ্রুপ করছেন।

ক্ষোভ নিয়ে কথগুলো বলছিলেন নিপন ত্রিপুরা। অবশ্য নিপনের ক্ষোভের কারণও আছে। নিপনের মাতৃভাষা ককবরক। কিন্তু শুরু থেকেই শিখতে হয়েছে বাংলা। খাগড়াছড়ি এবং রাঙামাটিতে পড়াশোনার পাঠ চুকিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মনোবিজ্ঞানে পড়াশোনা শেষ করেছেন তিনি। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে নিপন একুশের প্রথম প্রহরে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো থেকে শুরু করে সব আয়োজনে থাকতেন স্বতঃস্ফূর্তভাবে। কারণ ভাষা শহীদদের ত্যাগের প্রতি শ্রদ্ধা আছে তাঁর।

ছবি: নিপন ত্রিপুরা

শুধু নিপন নন, দেশের অন্য ভাষাভাষী অনেকের অভিজ্ঞতাও কাছাকাছি। পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরা এবং সমতলের সাদরি ও গারো- এই পাঁচ ভাষায় প্রাথমিক শিক্ষাক্রম চালু করা হয়েছে। সরকারি পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রাক-প্রাথমিক থেকে দ্বিতীয় শ্রেণি পর্যন্ত নিজেদের ভাষায় পড়াশোনা করবে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর শিক্ষার্থীরা। শিক্ষক ও কর্মকর্তারা শুরু থেকেই বলছেন, ভাষায় দক্ষতা না থাকার কারণে শিক্ষকরা এই বইগুলো শিক্ষার্থীদের পড়াতে পারছেন না। ফলে এ উদ্যোগে আখেরে সুফল পাচ্ছে না শিক্ষার্থীরা।

ছবি: অলিক মৃ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস সামনে রেখে বাংলাভিশন অনলাইনের কথা হলো বেশ কয়েকজন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর তরুণদের সংগে। তেমনই একজন অলিক মৃ। তাঁর মাতৃভাষা গারো। টাঙ্গাইলের মধুপুরের সন্তান মৃ পড়াশোনার পাঠ চুকিয়েছেন আহছানউল্লা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে; ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকটনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে। আলাপচারিতার শুরুতেই বললেন, ‘আমানি খু আংনি রাসং’। যার বাংলা অনুবাদও করলেন তিনি- মায়ের ভাষা আমার গর্ব। জানালেন, গারো ভাষাকে তাঁদের ভাষায় বলে মান্দি। বাংলাদেশ আদিবাসী ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে থাকা মৃ বলেন, ‘সরকার আমাদের ৫০টি জাতিগোষ্ঠীর স্বীকৃতি দিচ্ছে, কিন্তু আমরা বলি ৫৪টির অধিক জাতিগোষ্ঠীর বসবাস রয়েছে দেশে। প্রতিটি ভাষাকেই স্বীকৃতি দেওয়া হোক এবং সবাইকে মাতৃভাষায় শিক্ষার সুযোগ দেওয়া হোক। প্রতিটি ভাষাকেই যেন সম্মান প্রদর্শন করা হয়। তাহলে শুধু বাংলেদেশেই না, বিশ্বে অনেক ভাষা টিকে থাকবে। যে ভাষা আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে, সে দেশে সবার স্ব-স্ব মাতৃভাষা স্বীকৃতি পাক। যে দেশে ভাষার জন্য জীবন দিয়েছে, আমরা চাই এ দেশের মানুষের যেন ভাষার জন্য আর জীবন দিতে না হয়।’

দেশে সরকারিভাবে স্বীকৃত ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী ৫০টি। এদের প্রায় ৪০টি ভিন্ন ভিন্ন ভাষা প্রচলিত আছে। চাকমা, সাঁওতাল, তঞ্চঙ্গ্যা, মারমা, মান্দি, ককবরক, সাদরি, মণিপুরি, কুডুঁখ, হাজং, কোচ, খাসি, খুমি, খিয়াং, মুন্ডা, ম্রো, চাক, পাত্র, সৌরা, পাংখোয়া বাংলাদেশে বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীদের উল্লেখযোগ্য ভাষা।

ছবি: সুলভ চাকমা

চাকমা ভাষাভাষী সুলভ চাকমা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী। কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি কমে যাওয়ায় ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী বাচ্চাদের শিক্ষার আগ্রহ বাড়ছে বলে জানান তিনি। তবে একইসংগে আশঙ্কার কথাও বললেন, ‘প্রত্যন্ত অঞ্চলে প্রাথমিক শিক্ষা থেকে ঝরে পড়ার হারই বেশি।’

মাতৃভাষা দিবসের অনুভূতি জানতে চেয়েছিলাম সুলভের কাছে। ‘জন্মগ্রহণের পর মায়ের বুকের দুধ খাওয়ার সংগে সংগে যে ভাষা শুনি, সেই ভাষায় নিজের অভিব্যক্তি প্রকাশ করার অনুভূতি পৃথিবীর অন্য কোনো অনুভূতির সংগে তো তুলনা হয় না। অন্য কোনো ভাষায় এইভাবে স্বাচ্ছন্দ্য পাওয়া যায় না। ধরেন, এইমূহুর্তে আমি আপনার সাথে বাংলায় বলতেছি, হয়তো আমি গুছিয়ে বলতেছি, কিন্তু এই কথাগুলোই যদি আমি আমার মাতৃভাষায় বলতাম, সেটা একেবারেই স্বতঃস্ফূর্ত হতো।’

চাকমাদের মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা কতোটা কাজে আসছে, এমন প্রশ্নের জবাবে সুলভ জানালেন ‘আমরা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা তো বাংলাতেই শিখছি। আমাদের মাতৃভাষার চর্চাটা ভাব আদান প্রদানে চালু আছে। কিন্তু ওইটা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে, লিখিতভাবে কিংবা সরকারি কোনো উদ্যোগ নিয়ে এখন পর্যন্ত হয়নি।’

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের প্রসংগ আসতেই নিজের মায়ের ভাষা স্মরণ করলেন সুলভ চাকমা। ‘মা মুত্তুন শিক্ষে কোধা পিত্তিমিত বেগ ও ডোল কোধা, মুই মা মুত্তুন শিক্ষোঙ্গে হোদাগান অমুহুদু হোঝপাঙ।’ যার বাংলা অর্থ প্রত্যেক বাঙালির মনের কথাও- ‘মায়ের মুখ থেকে শেখা কথামালাই পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর কথা, মায়ের কাছে শেখা ভাষাটা আমি প্রচন্ড ভালোবাসি।’

বিভি/ইই/এইচডব্লিউ/এমএইচকে

You may also like

করোনায় ৭ জনের মৃত্যু, নতুন শনাক্ত ৬১৯ জন

করোনাভাইরাসের সংক্রমণে ২৪ ঘণ্টায় দেশে আরও সাত জন