বাংলা ভাষায় বিচারের রায় লেখা কতদূর?

‘শুভ ইসলাম’

১৫ ফেব্রুয়ারি-২০২১ বিকেল ৩ টা, সাদামাটা পোশাকে মনির নামে একব্যাক্তি কোর্ট চত্বরে কাগজ হাতে দাড়িয়ে, কারো জন্য অপেক্ষা করছে। কাছে যেতেই জিজ্ঞেস করল, বাবু, একটু পড়ে দেবেন? কাগজে কি লেখা আছে বুঝতে পারছি না, ইংরেজি লেখা, আমি’ত মুখ্যশুখ্য মানুষ। উকিল বাবুও তো চলে গেলেন। জিজ্ঞেস করলাম, কিসের কাগজ এটা। বলল, প্রতিবেশীর সাথে জমিজমা নিয়ে মামলায় তার ছেলেকে জেলে দিয়েছে। জামিনের জন্য আবেদন করেছিল তারই কাগজ।  

ছমির, হাইকোর্টের স্টাফ, ৫ বছর ধরে কাজ করছেন কোর্টে। প্রতিদিনই অনেক ফাইল আনা নেওয়া করে। দেখা হল হাইকোর্টের এ্যাটর্নি জেনারেল অফিসের সামনে। কাজ সুত্রে জিজ্ঞাসা, প্রতিদিন বিভিন্ন মামলার রায়ের কপি, মক্কেলের হাতে দেন, কখনো কি পড়ে দেখেছেন? ফ্যাল ফ্যাল করে মুখের দিকে তাকিয়ে, স্যার যতটুকু পড়াশুনা করেছি, কোনমতে চলে আরকি! এতো কঠিন ইংরেজি বুঝি না।

এরকম হাজারো ঘটনা প্রতিদিনই কোর্ট প্রাঙ্গনে ঘটছে। খুন, ধর্ষন, ছিনতাই, মারামারি ও প্রতারণা সহ হাজারো মামলায় রায় বিচারকরা ইংরেজিতে লিখছে। কতজন মানুষ আইন আদালতের এই কঠিন ইংরেজি শব্দগুলো জানে! পড়তে পারে!

ছবি: আদালত চত্ত্বর

১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর গণপরিষদে বাংলাদেশের সংবিধান গৃহীত হয়। এই সংবিধানের ৩ নং অনুচ্ছেদে উল্লেখ করা হয়েছে ‘রাষ্ট্রের ভাষা’ হবে বাংলা। সংবিধানের ১৫৩ নং অনুচ্ছেদের ২ দফায় বলা আছে, ‘বাংলায় এই সংবিধানের একটি নির্ভরযোগ্য পাঠ ও ইংরেজিতে অনূদিত একটি নির্ভরযোগ্য অনুমোদিত পাঠ থাকিবে। উভয় পাঠ নির্ভরযোগ্য বলিয়া গণপরিষদের স্পিকার সার্টিফিকেট প্রদান করিবেন।

১৯৭০ এর ডিসেম্বরে সাধারণ নির্বাচনের পর ১৯৭১ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন-‘আমি ঘোষণা করছি, আমাদের হাতে যেদিন ক্ষমতা আসবে সেদিন থেকেই দেশের সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালু হবে। বাংলা ভাষার পন্ডিতেরা পরিভাষা তৈরি করবেন, তার পরে বাংলা ভাষা চালু হবে, সে হবে না। পরিভাষাবিদেরা যত খুশি গবেষণা করুন, আমরা ক্ষমতা হাতে নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাংলা ভাষা চালু করে দেব, সে বাংলা যদি ভুল হয়, তবে ভুলই চালু হবে, পরে তা সংশোধন করা হবে’। (সূত্র : সরকারি কাজে বাংলা ব্যবহারে প্রশাসনিক নির্দেশনা পৃষ্ঠা-১৩, মো. মোস্তফা শাওন)।

মুজিননগর সরকার পরিচালিত হয়েছে কলকাতার ৮, থিয়েটার রোড থেকে। ভারতের সরকারি কাজে ব্যবহৃত ভাষা হচ্ছে ইংরেজি তাই সে দেশের সরকারের সঙ্গে খাপ খাইয়ে কাজ করতে গিয়ে মুজিবনগর সরকারকে ইংরেজি ভাষা ব্যবহার করতে হয়। ১৬ ডিসেম্বর দেশ শত্রুমুক্ত হলে বাঙালিরা চূড়ান্তভাবে নিজেদের একটি স্বাধীন ভূখণ্ড অর্জন করে। মুজিবনগর সরকারের মন্ত্রিসভার সদস্যগণ ২২ ডিসেম্বর কলকাতা থেকে ঢাকায় এসে পৌঁছান। ২৩ ডিসেম্বর বঙ্গভবনে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামের সভাপতিত্বে স্বাধীন দেশে মুজিবনগর সরকারের প্রথম কেবিনেট সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায় অনেক ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সিদ্ধান্ত গুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল বাংলা হবে সরকারি ভাষা বা দাফতরিক ভাষা। সেদিনকার সেই প্রথম কেবিনেট সভার কার্যবিবরণীও বাংলায় লিপিবদ্ধ করা হয়েছিল। (সূত্র : HUNREED YEARS OF BANGLADESH পৃষ্ঠা-৬৯, প্রেস উইং বঙ্গভবন)।

বঙ্গবন্ধু স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় এসে বাংলাকে সরকারি কাজ-কর্মে ব্যবহার করার নির্দেশনা দেন। ৮ ফেব্র্বয়ারি ১৯৭২ পত্রিকায় এই মর্মে সংবাদ প্রচারিত হয়েছিল যে, ‘তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী ইউসুফ আলী বলেছেন, ‘জীবনের সর্বস্তরে বাংলা চালুর প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়েছে।’ ১৯৭২ সালের ১৯ মে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি ‘দ্য বাংলা একাডেমি অর্ডার’ ১৯৭২ জারি করেন। এই আদেশ বলে ‘কেন্দ্রীয় বাংলা উন্নয়ন বোর্ড’ বাংলা একাডেমির সঙ্গে সমন্বিত হয় এবং কাউন্সিলের নাম পরিবর্তন করে ‘কার্যনির্বাহী পরিষদ’ করা হয়। বাংলা একাডেমির প্রধান নির্বাহী হিসেবে মহাপরিচালক পদ সৃষ্টি করা হয়। ১৯৭২ সালে বাংলা একাডেমি অফিস আদালতে ব্যবহার ও অনুশীলনের জন্য পরিভাষার একটি ছোট কোষ প্রকাশ করে। ১৯৭৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রপতি, বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী মাতৃভাষার মাধ্যমে উচ্চশিক্ষার যথাযথ বাস্তবায়নের জন্য দ্রুততর কার্যক্রম গ্রহণ এবং সুচিন্তিত ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছিলেন। উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে বিশেষ করে বিজ্ঞান ও কারিগরি বিষয়গুলোতে পরিভাষার উপযুক্ত সমস্যা ও এর সমাধানের জন্য শিক্ষক ও ভাষাতাত্ত্বিকদের আহ্বান জানিয়েছেন। ১৯৭৫ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি বাংলা একাডেমি ‘প্রশাসনিক পরিভাষা’ প্রকাশ করে। (সূত্র : সরকারি কাজে বাংলা ব্যবহারে প্রশাসনিক নির্দেশনা, মো. মোস্তফা শাওন-১৪-১৫)।

ছবি: হাইকোর্ট

এরপর ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে হাইকোর্টে আইনজীবী ড. ইউনুস আলী আকন্দের একটি রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ওই বছরের ১৭ ফেব্র্বয়ারি বিচারপতি কাজী রেজা-উল হক নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ বাংলা ভাষা প্রচলন আইন ১৯৮৭ অনুযায়ী অফিস-আদালত, গণমাধ্যমসহ সর্বত্র বাংলা ভাষা ব্যবহারের নির্দেশ কেন দেওয়া হবে না, তা জানতে চেয়ে র্বল জারি করেন। পাশাপাশি দূতাবাস ও বিদেশি প্রতিষ্ঠান ছাড়া দেশের সব সাইনবোর্ড, নামফলক ও গাড়ির নম্বর পেৱট, বিলবোর্ড এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়ার বিজ্ঞাপন বাংলায় লেখা ও প্রচলনের নির্দেশ দেন। সকলপ্রকার নামফলকে বাংলা ব্যবহার করতে বলেন। আদালতের আদেশের তিন মাস পর ২০১৪ সালের ১৪ মে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডগুলোকে আদেশটি কার্যকর করতে বলে। পরবর্তীতে ২০১৬ সালের ২৩ ফেব্র্বয়ারি স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়কে এক চিঠির মাধ্যমে সাইনবোর্ড, বিলবোর্ড, ব্যানার, গাড়ির নম্বর প্লেটে বাংলা ভাষার ব্যবহার নিশ্চিত করার অনুরোধ জানায় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। (তথ্যসূত্র: উইকিপিডিয়িা)

নিম্ন আদালতের চর্চিত ভাষা প্রধানত বাংলা। যদিও কোনো বিচারক ইংরেজি ভাষায় রায় দিলে তা বাতিল হয়ে যাবে না। উচ্চতর আদালতে দীর্ঘদিন যাবৎ সব কার্যক্রমে ইংরেজি ভাষা ব্যবহার করা বিচার বিভাগের একটি প্রথায় পরিণত হয়েছে। এ বিষয়ে বিচারপতি ওবায়দুল হাসান ৯ ফেব্র্বয়ারী, ২০২০ সালে বাংলাদেশ প্রতিদিনের একটি কলামে লিখেন, ইংরেজি ভাষায় লেখা রায়টি পুনঃলিখন বা অনুবাদের ব্যবস্থা নেই। কেননা উচ্চতর আদালতের রায়ের মাধ্যমে এটিকে বৈধতা দেওয়া হয়েছে। ইংরেজি ভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রে আমাদের দেশে দুই ধরনের মানসিকতা লক্ষণীয়। একটি হচ্ছে কেউ মনে করেন বাংলা না বলে ইংরেজি বললে বোধ হয় তাকে অনেক বেশি বুদ্ধিমান, দক্ষ এবং চটপটে মনে হবে  আরেকটি মানসিকতা হলো ইংরেজিকে বিজাতীয় ভাষা মনে করে একে তুচ্ছ জ্ঞান করা। দুটোর কোনোটিই কাম্য নয়। বাংলা ভাষার ওপর দখল কম থাকার কারণে ইংরেজি ভাষার ওপর নির্ভরশীল হয়ে উচ্চতর আদালতের বিচারকগণ কার্যক্ষেত্রে ইংরেজি ভাষাতেই কাজ করে থাকেন। আরেকটি মুখ্য কারণ ইংরেজি ভাষায় প্রয়োজনীয় আইনের বইয়ের সহজপ্রাপ্যতা।

বাঙ্গালীর ভাষার ইতিহাস, কোর্টের নির্দেশনায় সহজেই প্রতীয়মান হয় যে, বাংলা ভাষাকে সর্বস্তরে ব্যবহারে সব সময়ই তৎপর ছিল বাঙ্গালী। কিন্তু তারপরও কেন সর্বত্র বাংলা ব্যবহার হচ্ছে না? দেশের কোর্টে বিচারের রায়/আদেশ কতটুকুই বা বাংলায় লিখছেন বিচারকরা।

বিষয়ে ডেপুটি এ্যাটর্নি জেনারেল জান্নাতুল ফেরদৌসী রুপা জানান, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি শেখ মো: জাকির হোসেন ২১/এনএক্স ডিভিশনাল বেঞ্চ সারা বছরই বাংলায় রায়/আদেশ লেখেন। বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট হাইকোর্ট বিভাগ ১৭/এনএক্স ডিভিশনাল বেঞ্চের বিচারক এম ইনায়েতুর রহিমও কিছু কিছু রায় বাংলা লেখা শুরু করেছেন বলে জানান তিনি।

২১/এনএক্স ডিভিশনাল বেঞ্চ সুত্রমতে, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি শেখ মো: জাকির হোসেন শপথ নেওয়ার পর থেকেই বাংলায় রায় লিখছেন। সুত্রমতে, প্রবেশন পিরিয়ডে থাকা অবস্থাতেও তিনি বাংলায় রায় লিখতেন।

বেঞ্চসুত্র মতে, মামলার পুরো প্রক্রিয়াটি ইংরেজির উপর নির্ভরশীল হওয়ায় বাংলায় রায় লেখার বিষয়টি কঠিন হয়ে পড়ে। এ ছাড়া বাংলার সঠিক বানান না জানা, বাংলা টাইপিং সমস্যা, অনেক ক্ষেত্রে বাংলায় আদেশ না লেখার ক্ষেত্রে মনস্তাত্ত্বিক ব্যাপারটিও কাজ করে। তাই অনেকে বাংলায় রায়/আদেশ লিখতে চায় না।

অন্যদিকে, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট হাইকোর্ট বিভাগ ১৭/এনএক্স ডিভিশনাল বেঞ্চ সুত্র বলছে, বিগত দুই বছর ধরে সপ্তাহে দুইশোর অধিক আদেশ বাংলায় লেখেন ১৭/এনএক্স ডিভিশনাল বেঞ্চ। এছাড়া সংশিৱষ্ঠ বেঞ্চ এ পর্যন্ত ২০টির অধিক পূর্ণাঙ্গ রায় বাংলায় দিয়েছেন।

বেঞ্চসুত্র বলছে, বাংলায় রায়/আদেশ না লেখার অভ্যাস, বাংলা লেখায় বেশি সময় লাগা, বিওদের লিগ্যাল টার্ম খুব বেশি না বোঝা এবং ইংরেজি শর্টহ্যান্ডে লেখে অভ্যস্ত হওয়ায় অনেক সময় রায়/আদেশ বাংলায় লেখা হয় না।

এছাড়া বিচারপতি মো আশরাফুল কামাল বিচারপতি আবু জাফর সিদ্দিকি বাংলায় রায়/আদেশ লেখেন বলে জানা গেছে।

তবে সবচেয়ে আশার বাণী হল, ১৭ ফেব্র্বয়ালী-২০২১ বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন সেলিম ও বিচারপতি মো. বদরুজ্জামানের সমন্বয়ে গঠিত ভার্চ্যুয়াল হাইকোর্ট বেঞ্চ একটি যুগান্তকারী রায় দেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় বোমা পুঁতে হত্যাচেষ্টার মামলায় ১০ জঙ্গির মৃত্যুদন্ড বহাল রেখে একই সঙ্গে যাবজ্জীবন কারাদন্ডপ্রাপ্ত এক আসামি ও ১৪ বছর দন্ডিত দুই আসামির সাজাও বহাল রেখে  এবং ১৪ বছর দন্ডিত আরেক আসামিকে খালাস দিয়ে ভাষার মাস উপলৰে বাংলায় রায় দিয়েছেন সর্ব্বোচ্চ আদালত।

ছবি: আমার বাংলা সফটওয়্যার

১৮ ফেব্র্বয়ারি, ২০২১ বৃহস্পতিবার সুপ্রিম কোর্টে ইংরেজি থেকে বাংলা ভাষায়  অনুবাদ সংক্রান্ত আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স  সফটওয়্যার “আমার ভাষা”-এর  উদ্বোধন করেছেন প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন । সুপ্রিম কোর্টের “আমার ভাষা” সফটওয়্যারের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, এই সফটওয়্যারের মাধ্যমে ইংরেজিতে প্রদত্ত আদালতের রায়গুলো সহজেই বাংলায় অনুবাদ করা যাবে। ফলে বিচারপ্রার্থী এবং সাধারণ জনগণের কাছে আদালতের রায়গুলো আরও সহজবোধ্য হবে।

রবিবার (২১ ফেব্র্বয়ারি, ২০২১) সকালে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদন করে সাংবাদিকদের প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন বলেছেন, অচিরেই সুপ্রিম কোর্টের সব রায় বাংলায় দেওয়া হবে। সৈয়দ মাহমুদ হোসেন বলেন, ‘গত ডিসেম্বরে আমরা একটি সফটওয়্যারের ব্যবহার শুরু করেছি। যার ফলে সুপ্রিম কোর্টের সব রায় ইংরেজি থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাংলায় রূপান্তরিত হচ্ছে। রূপান্তর কাজ শেষ হলে আমরা আরও গুছিয়ে নেব।’ প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে একটি অনুবাদ সেল গঠন করা হয়েছে। সেটি ইতোমধ্যেই কাজ শুরু করেছে বলেও জানান প্রধান বিচারপতি।

যে কোন সংগ্রাম বা আন্দোলন কোন না ব্যাক্তির মাধ্যমে শুরু হয়ে একসময় তা বাস্তবতায় রুপ নেয়। কোর্টে বাংলায় রায়/আদেশ লেখার যে প্রবণতা শুরু হয়েছে সময়ের বিবর্তনে তা কতদূর পর্যন্ত গড়ায় তা দেখার বিষয়। ফুলের কলির মত ধিরে ধিরে প্রস্ফুটিত হয়ে পুরো বিচারালয়কে বাংলায় রায় লেখার ব্যাপারে আন্দোলিত করে, নাকি প্রাণের ভাষাভাষীদের আশা আকাঙ্খা অঙ্কুরেই বিনাশ হয়।

জনপ্রশাসন মন্ত্রনালয় কোর্টের ২০১৪ সালের ১৪ মে আদেশটি সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডগুলোকে আদেশটি কার্যকর করতে বলে। পরবর্তীতে ২০১৬ সালের ২৩ ফেব্র্বয়ারি স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়কে এক চিঠির মাধ্যমে সাইনবোর্ড, বিলবোর্ড, ব্যানার, গাড়ির নম্বর প্লেটে বাংলা ভাষার ব্যবহার নিশ্চিত করতে আবারও অনুরোধ জানায় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। কোর্টের আদেশের কতটুকু বাস্তবায়ন করেছে দুই সিটি কর্পোরেশন?

কথা হয় ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো সেলিম রেজার সাথে। তিনি জানান, সরকারী আদেশ বাস্তবায়নে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন সর্বদায় সচেষ্ট। আদেশ বাস্তবায়নের বিষয়ে তিনি বলেন, বিলবোর্ড, নামফলক বাংলায় লেখার জন্য সরকারি আদেশের পরপরই উত্তর সিটি কর্পোরেশন সরকারের আদেশের অনুলিপি গণবিজ্ঞপ্তি আকারে জারি করা হয়েছে। এছাড়া বড়চেয়ে বড় ব্যাপার হল ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের ট্রেড লাইসেন্স প্রদানের সময় সাইনবোর্ড, বিলবোর্ড বাংলায় লেখা বাধ্যতামূলক লেখা দেয়া হয়। ভাষা শহীদের নামে সড়কের নামকরন করা হয়েছে এবং নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনার মাধ্যমে সার্বিক বিষয় গুলোকে সার্বক্ষনিক মনিটরিং করা হচ্ছে বলে জানান তিনি। বিদেশী বিভিন্ন কোম্পানিকে সাইনবোর্ড ইংরেজির পাশাপাশি বাংলায় লেখার বিষয়ে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে বলে জানান এই কর্মকর্তা।

ছবি: ইংরেজি সাইনবোর্ড উচ্ছেদ অভিযান

এ বিষয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের জনসংযোগ কর্মকর্তা মোঃ আবু নাসের জানান, সাইন বোর্ড, নাম ফলকে ইংরেজির পাশাপাশি বাংলায় লেখার ব্যাপারে মাসব্যাপী বিভিন্ন কার্যক্রম চলমান রয়েছে। ইতিমধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটির বেশিভাগ অঞ্চল তাদের কাজের অগ্রগতি প্রতিবেদন দিয়েছে। এসব অগ্রগতি থেকে জানা যায়, যেসব ব্যাক্তি বা প্রতিষ্ঠান এখনো বিজ্ঞাপন ফলক, নাম ফলক, গাড়ির নাম্বার প্লেট, বিজ্ঞাপন ও গণমাধ্যমের বিজ্ঞাপনে ইংরেজি ব্যবহার করছে, তাদের ইংরেজির পাশাপাশি বাংলায় লেখার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এ বিষয়ে সম্প্রতি একটি গণবিজ্ঞপ্তি জারি করেছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে , ২৮ ফেব্রুয়ারি-২০২১’র মধ্যে নির্দেশনা অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট ব্যাক্তি বা প্রতিষ্ঠান ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

শুধু আদেশ, বিজ্ঞপ্তি আর তদারকির মধ্যে কার্যকারিতাকে সীমাবদ্ধ রাখলে বাস্তবিক ফলাফল শুন্য। তাই সর্বস্তরে বাংলা ভাষার যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে দূর্বলতাগুলোকে খুঁজে বের করে কাটিয়ে উঠতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরো দায়িত্বশীল হতে হবে। ছড়িয়ে দিতে হবে বাংলার জয়গান। এছাড়া সকল বিচারপতিদের কাছে বাংলায় রায়/আদেশ লেখারও প্রত্যাশা থাকবে। যাতে মনিরের মত ব্যক্তিদের হাতে কাগজ নিয়ে কোর্ট প্রাঙ্গনে দাড়িয়ে থাকতে না হয় অন্যের অপেক্ষায়।

বিভি/এইচএস/এমএইচকে

You may also like

করোনায় ৭ জনের মৃত্যু, নতুন শনাক্ত ৬১৯ জন

করোনাভাইরাসের সংক্রমণে ২৪ ঘণ্টায় দেশে আরও সাত জন