৫২’র ভাষা আন্দোলনের অগ্রনায়ক মোহাম্মদ আফজাল

ছবি: ভাষা সৈনিক মোহাম্মাদ আফজাল

‘শুভ ইসলাম’

মোহাম্মদ আফজাল। একাধারে ভাষা সৈনিক, বীর মুক্তিযোদ্ধা, রাজনীতিবিদ ও জনপ্রতিনিধি। তিনি রংপুর পৌরসভার একজন জনপ্রিয় চেয়ারম্যান ছিলেন এবং একাধারে তিন মেয়াদে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়ে নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করেন। ছাত্র জীবন থেকেই সম্পৃক্ত ছিলেন বাম রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলন এবং ১৯৭১’এ মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৫৪ সালে রংপুর পাবলিক লাইব্রেরি মাঠে প্রথম শহীদ মিনার নির্মাণে তাঁর যথেষ্ট অবদান ছিলো। যদিও, স্মৃতির এই মিনারটি গুড়িয়ে দেয় পাক-শাসকরা। দেশ স্বাধীনের পর তিনি পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হলে  নিজস্ব উদ্যোগে একই স্থানে পুন:নির্মাণ করেন শহীদ মিনারটি। যা আজও মাথা উঁচু করে মহান ভাষা আন্দোলনে অংশ গ্রহণকারী শহীদদের স্মৃতির কথা জানান দিচ্ছে।

গুণী এই মানুষটির জন্ম ১৯৩৭ খ্রিস্টাব্দে রংপুর মহানগরীর মুন্সিপাড়ায়। পিতা মোহাম্মদ আজফার এবং মাতা আয়শা খাতুন। ৫২’র ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় অংশ গ্রহণকারী টগবগে সেই তরুণ আজ বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছেন। মোটামুটি চলাফেরা করতে পারলেও ক্ষীণ হয়ে এসেছে দৃষ্টি। অনেক কথা শুনতেও পান না। জীবন সায়াহ্নে এসে আক্রান্ত হয়েছেন বার্ধক্যজনিত নানা রোগে। তাঁকে সার্বক্ষণিক দেখভালের জন্য আছেন একজন কেয়ারটেকার। ইদানিং তার দিন-রাত কাটছে দাদার আমলে তৈরি মহানগরীর মুন্সীপাড়ার পৈত্রিক পাকা বাড়িতেই। বার্ধক্যের অলস দিনযাপনে পড়েন বিভিন্ন দৈনিক। টেলিভিশনে দেখেন পছন্দের ক্রিকেট খেলা। প্রবীণ এ ভাষা সৈনিকের সাথে ভাষা আন্দোলনের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা হয় বাংলাভিশন অনলাইনের।

বাংলাভিশন অনলাইন: সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রচলন আজও হয়নি, সর্বত্র বাংলা ভাষার প্রচলনে কি পদক্ষেপ নেয়া দরকার বলে আপনি মনে করেন ?

মোহাম্মদ আফজালঃ সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রচলনের ক্ষেত্রে যেমন রাষ্ট্রের দায়িত্ব রয়েছে, তেমনি  প্রতিটি নাগরিকেরও দায়িত্ব আছে। আদালতগুলোতে বিচারকরা ইংরেজিতে রায় লিখে থাকেন। কিন্তু তারা তো এ দেশের নাগরিক-বাঙালি। বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক-ইনি বাংলায় রায় দিতেন। পঞ্চম সংশোধনী বাতিলের রায় উনি দিয়েছেন। দেশের প্রত্যেক বিচারকের উচিত তাকে অনুসরণ করা। এ ছাড়া সামাজিক আন্দোলন না হলে সর্বস্তরে বাংলা চালু সম্ভব নয়। বাংলা ভাষার প্রতি হীনমন্যতার কারণে মানুষ বিভিন্ন সাইন বোর্ডে ইংরেজি লিখে থাকে । বিয়ের কার্ডও ইংরেজি ভাষায় ছাপানো হয়। মাতৃভাষার প্রতি চরম অবজ্ঞার কারণে এগুলো ঘটছে। বায়ান্ন’র ইতিহাসকে বুকে লালন করতে হলে অবশ্যই এসব চর্চা বন্ধ করতে হবে। মানুষের মনে ভাষা প্রেম ও মমত্ববোধ জাগ্রত করতে হবে। প্রতিটি সন্তানের মনে-মননে পরিবার থেকেই মাতৃভাষার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ জাগাতে হবে।

বাংলাভিশন অনলাইনঃ ভাষা সৈনিকদের নামের পূর্ণ তালিকা তৈরি হয়নি? এ বিষয়ে আপনার মন্তব্য কি?

মোহাম্মদ আফজালঃ ঐ সময়ে রাজধানীসহ সারা দেশে  যারা সক্রিয়ভাবে ভাষা সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং অংশগ্রহণ করেছেন তারা সবাই ভাষা সৈনিক। কিন্তু তাদের সঠিক তালিকা তৈরি হয়েছে বলে আমার জানা নাই। আর এতোদিন পর তা করা খুব কঠিন হবে। তবে প্রথম দিকে সম্ভব ছিল। তারপরও চেষ্টা করা দরকার। যাদেরকে সরকারিভাবে সম্মান-সম্মাননা দেয়া হয় মানুষ মনে করে তারাই শুধু ভাষা সৈনিক। এমন ধারণা ঠিক নয়। কারণ ঐ সময়ে রাজধানীসহ পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিটি স্কুল-কলেজের ছাত্র-ছাত্রীরা ভাষা আন্দোলনে ভুমিকা রেখেছে। সেই সাথে ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন শ্রেণির পেশাজীবী মানুষও ভাষার দাবিতে সোচ্চার ছিল।

বাংলাভিশন অনলাইনঃ আমাদের মাতৃভাষা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত হলেও আমরা কতটুকু ভাষার মান রাখতে পারছি? নাকি এসব শুধু ঘোষণার মধ্যেই সীমাবদ্ধ? যদি তাই হয়, এর থেকে উত্তরণের উপায় কি বলে আপনি মনে করেন ?

মোহাম্মদ আফজালঃ (অনেকক্ষণ চুপ থেকে)  ভাষা আন্দোলনের পর এ দেশের কাব্য, সাহিত্য, গান, নাটক, গল্প ইত্যাদিতে যথেষ্ট উন্নতি হয়েছে। তবে যেহেতু এটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত তাই এ ভাষায় গুরুত্ব মেনে চলা দরকার। শুধু ফ্রেব্রুয়ারি আসলেই বাঙালিয়ানা দেখানো যাবে না। সারা বছর ভাষার খবরাখবর রাখতে হবে। নিয়মিত সংবাদ পরিবেশন করতে হবে। তরুণদের উদ্বুদ্ধ করতে ভাষা নিয়ে সংগঠন ভিত্তিক কাজ আরো বেশি করতে হবে।

বাংলাভিশন অনলাইনঃ ৫২’র ভাষা আন্দোলনের সময়ের কোন স্মৃতি আপনাকে আন্দোলিত করে ?

মোহাম্মদ আফজালঃ (আবারও অনেকক্ষণ চুপ থেকে) স্মৃতি’তো অনেক। ১৯৫২ সালে আমি ঢাকা কলেজের ছাত্র । ভাষা আন্দোলনের সময় যখন ঢাকায় থাকতাম তখন সেখানে আমার অনেক সহযোদ্ধাদের সাথে আন্দোলন করেছি। রাশেদ খান মেননের বড় ভাই এনায়েত উল্লাহ খান, আমার সিনিয়র আব্দুল গাফ্‌ফার চৌধুরী, ইকবাল আনসারি, মীর হোসেন (কুমিল্লা) উনাদের সাথে আন্দোলন করেছি। ঐ সময় কমিউনিস্ট পার্টির মুখপত্র “শিখা ” প্রকাশের অপরাধে আমাদের সিনিয়র কাজী আব্দুল বারীকে ১০টি বেত্রাঘাত করা হয়েছিল। তখন আমরা বেড়ার ফাঁক দিয়ে দেখি  জল্লাদ একটি লম্বা ছড়ি দূর থেকে ঘোরাতে ঘোরাতে কাজী আবদুল বারির কাছে গিয়ে তাঁর শরীরে  সজোরে আঘাত করে। প্রথম আঘাতে সে মাটিতে পড়ে যায়। পরে আরও ৯টি বেত্রাঘাত করা হয়। আব্দুল বারি তুখোড় ছাত্র ছিল। এই বেত্রাঘাতের ফলে তার শ্রবণ শক্তি হ্রাস পায়।  সে আর কানে শুনতে পেতো না।

এদিকে, যখন রংপুর আসতাম তখন কারমাইকেল কলেজের ছাত্র পীরগঞ্জের মতিউর রহমান-ইনি পরে মন্ত্রী ছিলেন, সুফি মোতাহার হোসেন, কাজী আব্দুল হালিম-পীরগঞ্জ, আনোয়ার হোসেন-নীলফামারি, মকসুদার রহমান চৌধুরী ডাক নাম খাজা চৌধুরী, সেকেন্দার আলী, নূরুল ইসলাম, আশরাফ হোসেন বড় দা, আনিসুল হক পেয়ারা, নাজ্জাতুল আলম, মহিলাদের মধ্যে আফতাবুন্নাহার, মিলি চৌধুরী! এমন অসংখ্য ব্যাক্তি আছে যাদের নাম মনে আসছে না। কেউ কলেজে পড়তো, আবার কেউ স্কুলে পড়তো তাদের সাথে আন্দোলন সংগ্রাম করেছি। এই লোকগুলো প্রায় সবাই মারা গেছেন। দুই একজন ছাড়া। এইগুলো স্মৃতিতে ভাসে।

বাংলাভিশন অনলাইনঃ আপনাদের ত্যাগের বিনিময়ে আমরা মাতৃভাষা পেয়েছি। অনেকেই মৃত্যুবরণ করেছেন। আপনারা যারা বেঁচে আছেন কতটুকু সম্মান পেয়েছেন?

মোহাম্মদ আফজালঃ (অনেকক্ষণ চুপ থাকার পর) ভাষা সংগ্রামীদের অনেককে রাষ্ট্রীয় এবং অনেককে সামাজিকভাবে সম্মাননা দেয়া হয়েছে। এখনও দেয়া হচ্ছে।  আমরাইতো রংপুরে একশ’ জনের বেশি ভাষা সৈনিককে সংবর্ধনা দিয়েছি। অনেকদিন তো হয়ে গেল, আমার মনে হয় সবাই কমবেশি সম্মাননা পেয়েছেন। আমিও পেয়েছি। রংপুরেও পেয়েছি; ঢাকাতেও পেয়েছি। সরকারিভাবে পাইনি। কেন পাইনি? হয়তো আমার সে যোগ্যতা নাই। আমার আর কোন চাওয়া-পাওয়া নাই। ভাষার জন্য আন্দোলন করেছি। স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করেছি। দেশ স্বাধীন হয়েছে। এতেই আমি খুশি।

কবি আল মাহমুুদ তাঁর “একুশের কবিতায়” লেখেন-

ফেব্র্বয়ারির ২১ তারিখ

দুপুর বেলার অক্ত,

বৃষ্টি নামে, বৃষ্টি কোথায়?

বরকতেরই রক্ত।

কবি আল মাহমুদের এ কবিতার মাঝে ফুটে ওঠে ভাষা আন্দোলনের মহত্ব। ভাষা আন্দোলনের ত্যাগ। জীবন বাজি রেখে বাঙলার যে সমস্ত দামাল সন্তানেরা নিজের বুকের তাজা রক্তে রাজপথ রঞ্জিত করে আমাদের মাতৃভাষা এনে দিয়েছেন, তাদের অনেকেই আজ নেই। হাতে গোনা যে ক’জন বেঁচে আছেন, তারাও বার্ধক্যের কারণে রোগে আক্রান্ত। জাতির এই সূর্য সন্তানদের শুধুমাত্র ভাষার মাসে নয়। তাঁদের খোঁজ নিতে হবে সারা বছর। দ্রুত চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশ করে দিতে হবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি। নিশ্চিত করতে হবে তাদের সুযোগ সুবিধা।

বিভি/এসআই/এমএইচকে

You may also like

করোনায় ৭ জনের মৃত্যু, নতুন শনাক্ত ৬১৯ জন

করোনাভাইরাসের সংক্রমণে ২৪ ঘণ্টায় দেশে আরও সাত জন