ভারত সফরে পররাষ্ট্র সচিব: প্রত্যাশা-প্রাপ্তির ফারক কতটুকু কমবে

সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী ২৬ মার্চ ঢাকা সফরে আসবেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। তাঁর আসন্ন ঢাকা সফরে কিছু বিষয়ে সমঝোতা স্মারক যাতে সই হয় সে ব্যাপারে কথা বলতে ভারত সফরে গেছেন পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন। তিস্তা বাদে বাকী ৬ টি নদীর পানিবন্টন বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত হতে পারে বলে আভাস দিয়েছেন তিনি।

তিনদিনের ভারত সফরে ঢাকা ছাড়ার আগে গণমাধ্যমের সাথে কথা বলেছেন পররাষ্ট্র সচিব মোমেন। জানিয়েছেন, বাণিজ্য, ঋণ সহায়তা, বিদ্যুৎ উৎপাদনে সহযোগিতাসহ দ্বিপক্ষীয় নানা ইস্যুতে বাংলাদেশ-ভারত পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হবে শুক্রবার।

গত বছরের ডিসেম্বর মাসে বাংলাদেশ ও ভারতের প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে ভার্চুয়াল মাধ্যমে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেসময় কৃষি, হাইড্রোকার্বণসহ অন্যান্য ইস্যুতে সাতটি সমঝোতা স্মারক সই ও কিছু প্রকল্পের উদ্বোধন হয়। এছাড়া বাণিজ্য, সীমান্ত, ট্রানজিট ফিসহ নানা বিষয়ে আলোচনা হয়। দিল্লী সফরে এসব বিষয়ের অগ্রগতি নিয়ে আলোচনা হবে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র সচিব মোমেন। ভারতের পররাষ্ট্র সচিব হর্ষ বর্ধণ শ্রিংলার সাথে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সফরের নানা দিক নিয়েও আলোচনা হবে বলে জানান তিনি।

মাসুদ বিন মোমেন জানিয়েছেন, দু’দেশের মধ্যে তিস্তাসহ ছ’টি অভিন্ন নদীর পানিবন্টনের বিষয়টি এখনও আটকে আছে। নয়দিল্লীকে এসব বিষয়ে দ্রুত সমাধানের তাগিদ দেয়া হবে। এছাড়া, আঞ্চলিক যোগাযোগ বৃদ্ধি, বাংলাদেশকে দেয়া ভারতের ঋনসহ অন্যান্য বিষয়েও আলোচনা হবে। গত বছরের ডিসেম্বরেই পররাষ্ট্র সচিবের ভারত সফরের কথা থাকলেও তিনিসহ একাধিক কর্মকর্তা করোনাভাইরাসে আক্রন্ত হবার জেরে তার স্থগিত করা হয়।

দুই দেশের মধ্যে স্থল ও সমুদ্র-সীমা নির্ধারণ, ছিটমহল বিনিময় এসব বিষয়ে অগ্রগতি একটি বড় অর্জন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তবে, বাংলাদেশের বহুল প্রত্যাশিত তিস্তা নদীর পানি বণ্টন চুক্তি না হওয়া এবং রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমারকে ভারতের পক্ষ থেকে চাপ দেয়ার বিষয়টি এখনও ঝুলে থাকায় সমালোচনা আর অনাস্থার পরিবেশ ডালপালা মেলছে। ১৯৯৬ সালে গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তি হলেও ভারতের নানা টালবাহানায় আলোর মুখ দেখেনি বাংলাদেশের উত্তরের জীবনরেখা তিস্তা। ২০১১ সালে দু’দেশের মধ্যে তিস্তা চুক্তি স্বাক্ষরের সব প্র্রস্তুতি নেয়া হলেও পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বিরোধিতায় তা সম্পন্ন হয়নি। এরপর নানা অজুহাতে দীর্ঘ হয়েছে অপেক্ষার প্রহর।

২০১৪ সালে তিস্তার পানি একতরফা প্রত্যাহার করে নেয় ভারত। এতে তিস্তা অববাহিকায় পানির ভীষণ সংকট দেখা দেয়। তিস্তায় যখন পানির প্রয়োজন ৫ হাজার কিউসেক, তখন পানি পাওয়া যায় মাত্র ২০০-৩০০ কিউসেক। কখনো কখনো এরও কম। যৌথ নদী কমিশনের বিশেষজ্ঞ সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল এ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিসেস এর নির্বাহী পরিচালক মালিক ফিদা এ খান জানান, আন্তঃসীমান্ত নদীর পানি ভাগাভাগির ক্ষেত্রে চুক্তি খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ চুক্তির মাধ্যমেই একটি দেশের পানির হিস্যা প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা হয়।

ভিসা প্রক্রিয়া সহজ করায় ভারতে আসা-যাওয়া বাড়লেও বাংলাদেশের মানুষের একটি বড় অংশের মধ্যে প্রবল ভারতবিরোধী মনোভাব রয়ে গেছে এখনও। সেইসাথে আছে বাংলাদেশের ক্ষমতার পটপরিবর্তনে ভারতের হস্তক্ষেপের প্রচলিত ধারণা। আওয়ামী লীগের সাথে ভারতের ঐতিহাসিক সুসম্পর্ক থাকার পরও এসব জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ভারতের অনীহা ভারতবিরোধী মনোভাব কমে আসার বদলে বাড়ছে দিনকে দিন।

বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির জানান, দুই দেশের সরকারের মধ্যে ভালো সম্পর্কের পাশাপাশি জনগণ সেটিকে কিভাবে মূল্যায়ন করছে সেটিও বিবেচনা করতে হবে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি বাংলাদেশের সাধারণ নির্বাচনের ক্ষেত্রে ভারত যে ভূমিকা নিয়েছিল সেটি বাংলাদেশের মানুষ ভালোভাবে দেখেনি বলেও মনে করেন তিনি।

বাংলাদেশের ভেতরে অনেকেই মনে করেন, দীর্ঘসময় ক্ষমতায় থেকে আওয়ামী লীগ সরকার ভারতের স্বার্থকে গুরুত্বের সাথে মূল্যায়ন করে আসলেও প্রতিদান পায়নি তেমন। এ বিষয়টি ভারতীয় নীতিনির্ধারকদের ভেবে দেখা দরকার বলেও মনে করছেন তারা।

You may also like

করোনায় ৭ জনের মৃত্যু, নতুন শনাক্ত ৬১৯ জন

করোনাভাইরাসের সংক্রমণে ২৪ ঘণ্টায় দেশে আরও সাত জন