এড়িয়ে নয়, মানিয়ে চলুন নেতিবাচকদের

আমার পরিচিত এক ছোট ভাই আছে যার নাম অনিক। দেখতে-শুনতে ছেলেটি বেশ সুন্দর এবং লেখাপড়ায়ও অনেক ভাল। ঢাকার একটি নামকরা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে লেখাপড়া শেষ করেছে। তার কাছের বন্ধু-বান্ধবরা অনেকেই চাকরি নিয়ে স্বাভাবিক জীবনযাপন করলেও অনিক এখনও চাকরি নিয়ে স্বাভাবিক একটি গোছানো জীবন শুরু করতে পারেনি। এর মূল কারণ হলো অনিক ব্যক্তি জীবনে পুরোপুরি একজন নেতিবাচক চিন্তার মানুষ। অনিক কোন কাজে গেলে সেই কাজের ভাল কোন দিক না খুঁজে শুধু খারাপ দিকগুলো নিয়ে চিন্তা করতে থাকে। একটা সময় সে কাজটি শুরুর আগেই হতাশ হয়। ফলে কাজটি আর শুরু করা হয়ে ওঠে না তার। সে অনেক ভাল চাকরিও হারিয়েছে এ নেতিবাচক মানসিকতা ধারণ করার জন্য। অথচ অনিকের পরিচিত বন্ধুরা অনেকে খুব ভালভাবে চাকরি করে যাচ্ছে।

এ তো গেল এক অনিকের বিষয়। অনিক ছাড়াও আমাদের চারপাশে পরিচিত-অপরিচিত বন্ধু-বান্ধব, সহকর্মীসহ অনেক মানুষই বিদ্যমান যারা সর্বদা সব কিছুতে নেতিবাচক চিন্তা-ভাবনা করে থাকে। সহজভাবে বলতে গেলে আমাদের চারপাশে নেতিবাচক চিন্তার মানুষের সংখ্যাই বেশি। মানুষ সামাজিক জীব। তাই, জীবনে চলার পথে আপনাকে কম-বেশি সব ধরনের মানুষের সঙ্গে প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে চলতে হয়। ফলে সংখ্যায় বেশি এসব নেতিবাচক চিন্তার মানুষকে আপনি এড়িয়ে চলতে পারবে না ইচ্ছা থাকলেও। তাই, এদের এড়িয়ে না চলে এদের সঙ্গে সমন্বয় করে চলেই নিজেকে এগিয়ে নিতে হবে। আসুন জেনে নেই কিভাবে নেতিবাচক মানুষদের সঙ্গে সমন্বয় করে চলতে হয়।

এদের সঙ্গে তর্কে যাবেন না :

নেতিবাচক মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক ভাল রেখে চলার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, যুক্তি দেখিয়ে এদের সঙ্গে তর্কে যাওয়ার চেষ্টা করবেন না। কারণ, নেতিবাচক চিন্তার মানুষরা নিজেদের মতামতের বিষয়ে খুবই শক্ত অবস্থানে থাকে। তাই আপনার বাস্তবসম্মত যুক্তি কখনই তাদের মতের পরিবর্তন করাতে পারবে না। বরং তারা উল্টো আপনাকে তাদের মতের পক্ষে অযুক্তিক ব্যাখ্যা দেবে। আপনার কথা যতই যৌক্তিক বাস্তবসম্মত হোক না কেন শেষ পর্যন্ত আপনাকে হারতেই হবে। অতঃপর, নিজের মতামত প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এমন কঠোর অবস্থানে থাকা মানুষের সঙ্গে তর্কে যাবেন না। তারা কিছু বললে সেখানে আপনার নতুন করে কিছু না বলাই ভাল।

এদের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিন :

নেতিবাচক চিন্তার মানুষরা নিজেদের যোগ্যতার খবর না রেখে সব ব্যর্থতার জন্য তারা অন্যকে দায়ী করে থাকে। তাদের অন্যদের প্রতি সব সময়ই একটি অভিযোগ তাদের কেউ সাহায্য করে না। মূলত তারা নিজেরাই নিজেদের জীবন কর্ম সম্পর্কে সচেতন নয়। আবার নেতিবাচক মানসিকতার কারণে নিজের সমস্যায় অন্যকে দোষারোপের প্রবণতা তাদের মধ্যে থাকেই। তারা অন্যের সাহায্য পেতে অনুরোধ করার পরিবর্তে দাবি নিয়ে অভিযোগ করে। তাই নিজে বুঝে, সাধ্যমতো এদের প্রতি সহমর্মিতা দেখান।
* পরামর্শ না দিয়ে সহমর্মী হোন :  আপনি কোন বিষয়ের ওপর চরম বিরক্তি থাকলে, হতাশ থাকলে সেই সময় যদি কেউ আপনাকে সান্ত্বনা দেয়, আপনার দুঃখের ভাগি হয়, তাহলে অবশ্যই আপনার ভাল লাগবে। নেতিবাচক মানুষরা তাদের কাজের বিষয়ে অন্যের পরামর্শের থেকে সহযোগিতা বেশি আশা করে। তাই এদের পরামর্শ দিয়ে সমস্যার সমাধান করে দেয়ার চেষ্টা না করে এদের প্রতি সহমর্মী হোন। কেননা, আপনি তাদের পরামর্শ দিলে আপনার বিরুদ্ধাচরণ করবে, তর্কে জড়াবে। তাই তাদের পরামর্শ না দিয়ে সহমর্মী হোন। এক সময় তারা নিজেরাই তাদের সমাধান খুঁজে নিতে পারবে।
* এদের সঙ্গে একা আলোচনায় যাবেন না :  নেতিবাচক মানুষের সঙ্গে কোন বিষয়ে একা আলোচনায় যাবেন না। তাহলে তার সব নেতিবাচক চিন্তা, ধ্যান-ধারণা আপনার ওপর চাপিয়ে দেবে এবং যতই ভাল কথা বলেন, আপনি তার খারাপ কথায় জর্জরিত হয়ে যাবেন। তাই নেতিবাচক মানুষের সঙ্গে আলোচনায়, সঙ্গে আও দু-একজন ইতিবাচক চিন্তার মানুষকে সঙ্গে রাখুন। মনে রাখবেন, নেতিবাচক বক্তব্য বেশিরভাগ ক্ষেত্রে যুক্তিহীন হয়ে থাকে। তার যুক্তিহীন বিষয়কে যুক্তি দিয়ে বোঝানো সত্যই অনেক কষ্টের কাজ। যা একা পেরে উঠতে না পারলেও আরও দু-একজন সঙ্গে নিয়ে বোঝালে বিষয়টি সহজ হবে।
* নেতিবাচক মন্তব্যগুলো এড়িয়ে যান :  নেতিবাচক মানুষের সঙ্গে ভাল সম্পর্ক রেখে চলার একটি চমৎকার উপায় হলো তার কথাগুলোকে এড়িয়ে যাওয়া। যেহেতু নেতিবাচক মানুষরা সব কিছুতেই না সূচক কথাই বেশি বলে। তাই তার পক্ষ থেকে আপনার প্রতি অপ্রত্যাশিত কথা আসতে পারে। এসব কথা হাল্কভাবে গ্রহণ করুন। তার কথায় ছোট জবাব দিন। আমি জানি, দেখেছি, ঠিক আছে, ব্যাপার না এসব বলে মন্তব্য এড়িয়ে চলুন। তবে নেতিবাচক মানুষ কখনও ইতিবাচক কথা বললে, সেই কথায় অধিক গুরুত্ব দিন, উৎসাহ দিন, প্রশংসা করুন বেশি করে। এতে হয়ত সে তার নেতিবাচক চিন্তা থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে। তার ভেতর ইতিবাচক চিন্তার বৃদ্ধি ঘটবে ধীরে ধীরে।

পরিশেষে জগতের কোন কিছুই চিরস্থায়ী নয়। এমনকি কারও কোন মন্তব্যও স্থায়ী হয় না। এই ছোট হিসাবটি মাথায় রাখলে নেতিবাচক চিন্তার মানুষকেও মানিয়ে নেয়া এত কঠিন কাজ হবে না। নিজের ভাল থাকা, সফলতার জন্যও চারপাশের মানুষকে মেনেই চলতে হয়। তাই উপরের বিষয়গুলো মাথায় রেখে সঠিকভাবে প্রয়োগ করলে আপনিও খুব সহজেই আপনার চার পাশের নেতিবাচক মানুষদের সঙ্গে চলতে পারবেন। এক সঙ্গে কাজ করতে পারবেন। অতঃপর নেতিবাচক মানুষকে এড়িয়ে না চলে নিজ বুদ্ধি দ্বারা তাদের সঙ্গে মানিয়ে চলুন।

এম শহিদুল ইসলাম, লেখক।

You may also like

টঙ্গীর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে কিশোরের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার

গাজীপুরের টঙ্গীতে শিশু উন্নয়ন কেন্দ্র থেকে রিজ উদ্দিন