আধুনিক নারীবাদী সাহিত্যিক সিমোন দ্য বোভোয়ার

সিমোন দ্য বোভোয়ার বিশ্বের মহান একজন নারীবাদী সাহিত্যিক। জন্ম ১৯০৮ সালের ৯ জানুয়ারি। ‘কেউ নারী হয়ে জন্মায় না বরং নারী হয়ে ওঠে’; মানুষের ইতিহাসে নারী সম্পর্কিত সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ এই বাক্য সিমোন দ্য বোভোয়ারের। তাঁকে নিয়ে লিখেছেন চন্দন উদাস…

জাতিতে ফরাসি সিমোন ছিলেন একাধারে ঔপন্যাসিক, দার্শনিক ও প্রাবন্ধিক। তাঁকে বলা হয়, আধুনিক নারীবাদের জননী। সিমোন-এর সাহিত্যিক জীবনের শুরু ‘ল্য’ এভিতে (১৯৪৩) উপন্যাসের মাধ্যমে। পরের দু’টিও উপন্যাস, বাংলায় নাম ‘অন্যদের রক্ত’ এবং ‘সব মানুষই মরণশীল’ (১৯৪৬)।

১৯৪৯ সালে সিমোন দ্য বোভোয়ার লেখেন তাঁর নারীবাদ বিষয়ক মহাগ্রন্থ ‘ল্য দ্যজিয়ম সেক্স’; যা ‘পিতৃতান্ত্রিক সভ্যতায় রুদ্ধ, সীমাবদ্ধ, বিকলাঙ্গ, দাসি ও কামসামগ্রীর স্তরে থাকা দণ্ডিত নারীর পরিস্থিতি সম্পর্কে অদ্বিতীয় গ্রন্থ। ব্যাখ্যা, বিশ্লেষণ ও শিল্পসৌন্দর্যে অতুলনীয় গ্রন্থটি বিশ্বব্যাপী নারী ও পুরুষকূলে সমান পঠিত ও জনপ্রিয়।’ দার্শনিক জাঁ পল সার্ত্রকে আমরণ বন্ধু-সঙ্গী হিসেবে বেছে নিলেও বোভোয়ার পুরুষদের প্রতি বন্ধুভাবাপন্ন ছিলেন না। বরং পুরুষদের প্রতি নিত্য দোষারোপই তাঁর ‘দ্বিতীয় লিঙ্গ’-এর নৈমিত্তিক বিষয়। বোভোয়ার বিয়ে করেননি। সম্ভবত তিনি স্থির সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছিলেন যে, বিয়ে নারীর জন্য শিকল ছাড়া কিছুই নয়। ‘দ্বিতীয় লিঙ্গ’-এর বিবাহিত নারী অধ্যায়ে তিনি দেখিয়েছেন বিবাহ নামক প্রতিষ্ঠানটিতে নারী কীভাবে নিকৃষ্ট ভূমিকায় এবং পুরুষ কীভাবে উৎকৃষ্ট ভূমিকায় অভিনয় করে যায়। নারীর মাতৃত্বকে মহিমান্বিত করার পুরুষতান্ত্রিক প্রচেষ্টা দেখে তিনি উপহাস করে লিখেছেন ‘মাতৃত্ব নারীর পেশা’।

দ্য বোভোয়ারের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন অ্যালিস শোয়ার্জার। অ্যালিস বোভোয়ার-এর কর্ম সম্পর্কে লিখেছেন ‘পঞ্চাশ ও ষাটের তমসায় যখন নব নারী আন্দোলন দেখা দেয়নি, তখন দ্বিতীয় লিঙ্গ ছিলো গুপ্ত সংকেত-বিধির মতো, যার সাহায্যে আমরা নতুন নারীরা পরস্পরের কাছে বার্তা পাঠাতাম।’ সব নারীবাদী সাহিত্যিকের মতো সিমোন দ্যা বোভোয়ারও হয়েছেন অনেকের সমালোচনার শিকার এবং ধর্মগুরুদের আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু। ‘দ্বিতীয় লিঙ্গ’ প্রকাশিত হওয়ার পর ক্যাথলিকদের ধর্মীয় দুর্গ ভ্যাটিকানও গ্রন্থটি ‘অনৈতিক’ বলে নিষিদ্ধ করে।

বোভোয়ার-এর বাবা জর্জে বেরত্রা দ্য বোভোয়ার ছিলেন আইনজীবী, ধর্মীয় প্রশ্নে সন্দেহবাদী, একাধারে বিশ্ব নাগরিক। মা ফ্রাঁসোয়া ব্রাসেয়ো ছিলেন গোঁড়া ক্যাথলিক। দুই বোনের মধ্যে জ্যেষ্ঠ সিমোন বোভোয়ারকে অনেকটা পুত্রস্নেহেই বড় করেছেন জর্জে বেরত্রা। কারণ, তিনি মনে করতেন পুরুষের মগজ পেয়েছে সিমোন এবং সে চিন্তাও করে পুরুষের মতো।

ছোটবেলা থেকেই নিজের চারপাশকে বুঝতে শুরু করেছিলেন সিমোন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় পরিবারের আর্থিক অবস্থা খারাপ হয়ে উঠলে সিমোন দেখতে পান উদয়াস্ত কী দুঃসহ ক্লান্তিকর গৃহস্থালির কাজ করতে হয়েছে তাঁর মা-কে। এই ক্লান্তির মর্মস্পর্শী বর্ণনা দিয়েছেন তিনি দ্বিতীয় লিঙ্গ গ্রন্থে। মা এবং অন্য নারীদের গৃহকর্মে বাঁধা জীবন আতংকিত করে সিমোনকে। ‘দ্বিতীয় লিঙ্গ’ গ্রন্থে তাই এক তরুণীর দেখা মেলে- যে তার মায়ের একঘেঁয়ে গৃহস্থালির কাজ দেখে ভীত হয়ে ভাবে- একদিন নিজেও বাঁধা পড়বে এই নির্মম-নিরর্থক নিয়তিতে এবং স্থির করে ফেলে, কখনো মা কিংবা গৃহিণী হবে না সে।

সিমোন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নিয়েছেন প্যারিসে। দর্শনে এগ্রিগেশন উত্তীর্ণ সিমোন-ই আজঅব্দি এই ডিগ্রিধারী ফ্রান্সের সবচেয়ে কম বয়েসি নারী। পরীক্ষায় জাঁ-পল সার্ত্র হন প্রথম এবং সিমোন দ্বিতীয়। ফলে দু’জনের মধ্যে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে, পরে যা এক ব্যতিক্রমী প্রেমের সম্পর্কে গড়ায়। অবশ্য, ১৯৩০-এর দশকে তাঁদের এই সম্পর্ক সমাজের চোখে খুবই অপ্রথাগত বলে বিবেচিত হয়েছিলো। কেননা, তাঁরা একসংগেও থাকতেন না, আবার লিভ টুগেদারও করতেন না। বিয়ে করে একসংগে থাকা আর্থিকভাবে সুবিধাজনক মনে হলেও তাঁরা এই পথ বেছে নেননি। তাঁদের মনে হয়েছে, বিয়ে এমনকি একসংগে বসবাস মানুষের জন্য ক্ষতিকর। যেহেতু এই ব্যবস্থায় একজন হয়ে উঠতে চায় ‘কর্তা’ এবং অন্যজনকে পরিণত করতে চায় ‘কর্মে’। বিশ শতকের অন্যতম এই দুই দার্শনিক নিজস্ব চিন্তা ও কাজের মাধ্যমে পরস্পরকে প্রভাবিত করেছেন প্রচণ্ডভাবে। অবিবাহিত সন্তানহীন সিমোন আমরণ ডুবেছিলেন সার্ত্রের গভীর বন্ধুত্বে, যদিও অন্য প্রেমের কাছেও তিনি ধরা দিয়েছেন মাঝে-মধ্যে।

জীবিকার জন্য মাধ্যমিক স্কুলে শিক্ষকতা করেছেন সিমোন দ্য বোভোয়ার এবং নিজের মধ্যে মিলিয়েছেন কর্ম ও জ্ঞানকে। ফ্রান্সের বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন ও নানান অত্যাচারের বিরুদ্ধে সংঘটিত সংগ্রামের কেন্দ্রেও ছিলো তাঁর উজ্জ্বল উপস্থিতি। তিনি বলেছেন, ‘স্ত্রীলিঙ্গ তার প্রজাতির শিকার’, কারণ প্রজননের মাধ্যমে কেউ মানুষ হয়ে উঠতে পারে না। মানুষকে মানুষ হয়ে উঠতে হয় সৃষ্টি ও নির্মাণের মধ্য দিয়ে। পুরুষ নিজের জন্য অধিকতর স্বাধীনতা সৃষ্টির চেষ্টা করে কিন্তু ঐতিহাসিকভাবে সে নারীকে বঞ্চিত করে আকাঙ্খা ও উচ্চাভিলাষের অধিকার থেকে। নারীকে তাই ‘মানুষ’ হয়ে উঠতে দেওয়া হয় না। বিপরীতে তিনি চেয়েছেন নারী ও পুরুষের সাম্য ও প্রীতিপূর্ণ বিকাশ।

‘ল্য দ্যজিয়ম’-এর পর সিমোন লেখেন তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত উপন্যাস ‘লে মাঁদারে’। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ফরাসি বুদ্ধিজীবীরা কীভাবে তাঁদের ‘ম্যান্ডারিন’ মর্যাদা বা অভিজাত অবস্থান ছেড়ে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিয়েছিলেন, উপন্যাসে তা-ই উঠে এসেছে। উপন্যাস ছাড়াও সিমোন ভ্রমণকাহিনী, চারটি আত্মজৈবনিক গ্রন্থ এবং অসংখ্য প্রবন্ধ লিখেছেন। প্রচলিত অর্থে তিনি নিজেকে নারীবাদী বলতে নারাজ ছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, সমাজতন্ত্রের বিকাশের সংগে সংগে নারীর সমস্যা আপনা-আপনি সমাধান হয়ে যাবে। তাঁর সংজ্ঞায় নারীবাদী বলতে সেই নারী বা পুরুষকে বুঝায়, যিনি সংগ্রাম করছেন নারীর অবস্থা বদলের জন্য, যার সংগে থাকছে শ্রেণিসংগ্রাম এবং যারা নিরপেক্ষভাবে সমাজের অন্য কোনো পরিবর্তনের ওপর নির্ভর না করেও নারীর অবস্থা বদলে সংগ্রাম করতে পারেন।

You may also like

চট্টগ্রাম সিটি নির্বাচন শান্তিপূর্ণ হয়েছে: তথ্যমন্ত্রী

চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছে দাবি