একুশের সংস্কৃতি, চেতনা ও আমাদের কবিতা-০২

ছবি: সংগ্রহ

(পর্ব-০২)

রফিকউল্লাহ খান

বিগত পঞ্চাশ বছরের বাংলাদেশের কবিতার যে সম্পন্নতা ও বহুমাত্রিক বিস্তার, তার মূলে রয়েছে ভাষা আন্দোলনের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রেরণা। দেশ বিভাগের পর ‘নতুন কবিতা’ (১৯৫০) নামে যে সংকলন প্রকাশিত হয়েছিলো সেখানে অন্তর্ভুক্ত অনেক কবিই পরে বাংলাদেশের কবিতার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন। কিন্তু ঐ সংকলনে বিধৃত কবিতা বক্তব্য ও কাব্যভাষার সংগে পরের কবিতা তুলনা করলেই আমাদের কবিতায় ভাষা আন্দোলনের প্রভাবের স্বরূপ সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। পঞ্চাশের দশকে কাব্য রচনায় আত্মনিয়োগ করেন যাঁরা, ভাষা আন্দোলন তাঁদের কবিতার বিষয় ও প্রকরণে এক স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য নিয়ে আত্মপ্রকাশ করে। এ সময়ের নবোদ্ভূত কবিদের মধ্যে শামসুর রাহমান, হাসান হাফিজুর রহমান, আলাউদ্দিন আল আজাদ, আবু জাফর ওবায়দুল্লা, আল মাহমুদ প্রমুখের কবিতায় ভাষা আন্দোলন বড় ধরনের পালাবদলের সূত্রপাত করেছে। এসব কবি বেরিয়ে এসেছেন নিঃসঙ্গতার অন্ধকার থেকে ব্যক্তিচেতনার নিভৃত স্বার্থপর জগত থেকে। স্থবির সমাজব্যবস্থার অন্তর্গত যে বিক্ষোভ ও রক্তক্ষরণ, কবিরা তা উপলব্ধি করেছেন গভীরভাবে। ভাষা আন্দোলনের বাস্তব অভিঘাত একজন কবির চৈতন্যে কতোটা আলোড়ন সৃষ্টি করতে পারে- শামসুর রাহমানের একটি কবিতা থেকে আমরা তা উপলব্ধি করতে পারি:

‘আমরা যখন ঘড়ির দুটো কাঁটার মতো

মিলি রাতের গভীর যামে,

তখন জানি ইতিহাসের ঘুরছে কাঁটা

পড়েছে বোমা ভিয়েতনামে।’ (প্রেমের কবিতা, নিরালোকে দিব্যরথ)।

কেবল ভিয়েতনাম কেন, পৃথিবীব্যাপী সাম্রাজ্যবাদী ধ্বংসযজ্ঞের প্রতিবাদে কবিরা সমাজ ও রাজনীতি-মনস্কই কেবল হয়ে ওঠেননি, তাঁদের মন-মানস ঋদ্ধ হয়েছে আন্তর্জাতিকতাবোধে- বিশ্বমানবের সংগে মিলনসাধনায়। কবিতার উপকরণ, ব্যবহৃত শব্দগুচ্ছ, পরিপ্রেক্ষিত, জীবনলোক, ঐতিহ্যসূত্র, পুরাণের জগত অপরিবর্তিতকালেও কবির আত্মপ্রকাশের প্রকৃতিতে ঘটে গেছে বড় ধরনের রূপান্তর। ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠা কবিকে করে তুলেছে আত্মবিশ্বাসী ও ব্যক্তিত্বমণ্ডিত। যে শামসুর রাহমানের কবিতাকে আমরা নগর-মানসের প্রতিবিম্ব হিসেবে চিহ্নিত করি, সেই নাগরিক অস্তিত্বকেও কবি প্রত্যক্ষ করেন অন্য চোখে: ‘এ-শহর প্রত্যহ লড়াই করে বহুরূপী নেকড়ের সাথে।’ (এ-শহর)

হাসান হাফিজুর রহমান, আলাউদ্দিন আল আজাদের কাব্যবস্তু ও কাব্যভাষা বাংলা কবিতার নতুন উৎসমুখ খুলে দেয়। হাসান হাফিজুর রহমান তাঁর সেই বিখ্যাত ‘অমর একুশে’ আনুভূমিক ও ভাষণধর্মী কাব্যপংক্তিমালায় উচ্চারণ করেনঃ

‘এখানে আমরা ফ্যারাউনের আয়ুর শেষ ক’টি বছরের

ঔদ্ধত্যের মুখোমুখি,

এখানে আমরা পৃথিবীর শেষ দ্বৈরথে দাঁড়িয়ে,

দেশ আমার, স্তব্ধ অথবা কলকণ্ঠ এই দ্বন্দ্বের সীমান্তে এসে

মায়ের স্নেহের পক্ষ থেকে কোটি কণ্ঠ চৌচির করে দিয়েছি

এবার আমরা তোমার।’ (অমর একুশে, বিমুখ প্রান্তর)।

আলাউদ্দিন আল আজাদ লেখেন: ‘ইটের (স্মৃতির) মিনার ভেঙেছে ভাঙুক। একটি মিনার গড়েছি আমরা/চার কোটি কারিগর।’ (স্মৃতিস্তম্ভ, মানচিত্র)। এই স্বদেশ ও জীবনলগ্নতা কেবল বাংলাদেশের নয়, সমগ্র বাংলা কবিতার পটভূমিতেই এক স্বতন্ত্র চেতনায় বিশিষ্ট হয়ে উঠেছে। কবিতায় ভাবালুতার পরিবর্তে প্রাধান্য পেলো মননশীলতা, নিঃসঙ্গ একাকী ভূখণ্ডে জেগে উঠলো আত্মবিশ্বাস ও সংগ্রামের রক্তিম চেতনাগুচ্ছ। ব্যক্তিগত প্রেমবোধের সংগে যুক্ত হলো দেশপ্রেম। এ থেকে মনে হওয়া স্বাভাবিক যে, ভাষা আন্দোলন ও রাজনৈতিক বক্তব্যনির্ভর কবিতাকেই আমরা প্রাধান্য দিচ্ছি। কিন্তু মনে রাখতে হবে, কবিতার আবহমান বিষয়বস্তুর সংগে এই সমষ্টিচেতনানির্ভর কাব্যবস্তুর সংযোগ বাংলাদেশের কবিতাকে এক বলশালী স্বাবলম্বী ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করেছে। ঐ সময়ে রচিত পশ্চিম বাংলার কবিতার সংগে তুলনা করলেই বাংলাদেশের কবিতার স্বতন্ত্র চরিত্র, কাব্যভাষা, প্রতীক ও চিত্রকল্পের নবত্ব এবং জীবনজিজ্ঞাসার অভিনবত্ব আমরা অনুভব করতে পারি। এ প্রসংগে উল্লেখ্য যে, ভাষা আন্দোলন বিভ্রান্তির অন্ধকার থেকে জাতীয় চৈতন্যকে মুক্তি দিয়ে প্রবাহিত করেছিলো আত্মসন্ধান ও জাতিসত্তাসন্ধানের ব্যাপক পরিসরে। ব্যক্তির অস্তিত্বজিজ্ঞাসাও স্বার্থপর নিভৃত জগত থেকে বহুলাংশে বেরিয়ে আসতে শুরু করে। ব্যক্তির আত্ম-জিজ্ঞাসায়ও ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হতে থাকে সমষ্টি-অস্তিত্বের সংরাগ ও সংগ্রাম।

ষাটের দশকে উদ্ভূত নতুন কবিদের মধ্যে জীবনের না-অর্থক দিকগুলোই বেশিমাত্রায় অভিব্যক্ত হতে দেখি। এ সময়ের কবিদের ‘জন্মান্ধ’, ‘জন্মেই কুঁকড়ে’ যাওয়া, ‘স্বপ্নের বাস্তব’-এর মুখোমুখি, আত্মরতিপ্রবণ এবং মধ্যবিত্তের জীবনচক্রে ঘূর্ণায়মান কবিমানসেও জীবনের রূপ ও তাৎপর্য স্বতন্ত্র অবলোকনের বিষয় হয়ে উঠেছে। কিন্তু ১৯৬২-র ছাত্র-আন্দোলন, বাঙালির মুক্তি-সনদ ৬ দফা ঘোষণা, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান সমগ্র জাতির মতো আমাদের সাহিত্যজগতকেও অলোড়িত করে প্রবলভাবে। এ সময়ের কবিতা, গান ও সাহিত্যের অন্য শাখায় এর প্রভাব হয় সর্বত্রগামী।

১৯৫২ থেকে ১৯৭১ কালপর্ব বাংলাদেশের কবিতার আত্মসংস্থিত হওয়ার কাল। কেননা, এ সময়ে কবিরা সামাজিক-রাজনৈতিক আকাক্সক্ষা ও সংক্ষোভকে যেমন কবিতায় রূপায়িত করেছেন, ব্যক্তিসত্তা বিকাশের বহুমুখী সম্ভাবনা নিয়েও তেমনি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন। সমাজ-অন্তর্গত ব্যক্তি-অস্তিত্বের যে হতাশা, পরাভবচেতনা, নৈঃসঙ্গবোধ ষাটের দশকের নবোদ্ভূত কবিদের কবিতায় লক্ষ করি, সেখানেও বৃহত্তর সমাজমানসবিচ্ছিন্ন নগরজীবনের অব্যাহত বিনষ্টি, অবক্ষয় সম্ভাবনাহীনতার অনুভব কাজ করেছে। এই বোধগুলোকে বিশ শতকের তিরিশের দশকের নেতিবাদী কবিতার অনুকরণ বললে ভুল হবে। কারণ, এ সময়ের কবিরা যে সমাজপটভূমির মধ্য থেকে আত্মপ্রকাশ করেছেন, তার সংরক্ত অনুভবই এক্ষেত্রে সর্বাপেক্ষা কার্যকর ছিলো বলে মনে হয়। পাশ্চাত্যের শিল্পকলা ও কবিতার অঙ্গীকার এক্ষেত্রে সঞ্চার করেছে বিশ্বজনীন চেতনাপ্রবাহ ও প্রকরণ-সতর্কতা।

স্বাধীনতা-উত্তর বিগত চার যুগের বাংলাদেশের কবিতা কেবল সামাজিক-রাজনৈতিক বক্তব্যকে কেন্দ্র করেই বিকাশ লাভ করেনি। ব্যক্তিসত্তা বিকাশের সম্ভাবনাময় ক্ষেত্রগুলোর উন্মোচন, মানব অস্তিত্বের বহুমুখী সংকট আবিষ্কার, নব্য ঔপনিবেশিকতা ও পুঁজিবাদী বিশ্বের ছদ্মবেশী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে শিল্প-প্রতিরোধ রচনা এবং গণতন্ত্র ও মুক্তচেতনা প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে বিগত তিন যুগে আমাদের কবিরা যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, তার তাৎপর্য অপরিসীম। কাব্যভাষার ব্যক্তিত্বচিহ্নিত প্রয়োগ কবির আত্মপ্রকাশকে করেছে স্বাবলম্বী।

ব্যক্তির অহং ও আত্মকেন্দ্রিকতার শব্দরূপ নির্মাণে আমাদের কবিরা সব কালেই আত্মনিয়োগ করেছেন। কিন্তু বাংলাদেশের কবিতাকে বার বার ফিরে আসতে হয়েছে সমষ্টিজীবনের আঙিনায়। রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক বাস্তবতাই প্রতিনিয়ত অনিবার্য করে তুলেছে আত্মসন্ধান ও সত্তাসন্ধানের প্রাসংগিকতা।

বিগত পঞ্চাশ বছরের কবিতার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে বাংলাদেশের কবিতার যে মূল লক্ষণ সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে, তা হলো সামূহিক জীবনজিজ্ঞাসা। প্রত্যাশা, ব্যর্থতা কিংবা যন্ত্রণাও এখানে সমষ্টিলগ্ন। এর সংগে যুক্ত হয়েছে স্বাধীনতা-উত্তর সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনের বহুমুখী ভাঙা-গড়া, উত্থান-পতন।

ভাষা আন্দোলনের চেতনাবীজ থেকে যে কাব্যধারার সংরক্ত অভিযাত্রার সূত্রপাত, উনিশশো একাত্তরেও শেষ হলো না তার সংগ্রামী পথচলা। গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, অসাম্প্রদায়িক চেতনা, প্রগতি ও শ্রেণিসাম্যের প্রতিষ্ঠা এবং সকল প্রকার অপশাসন থেকে মুক্তির সম্ভাবনা নিয়ে যে কবিতার যাত্রা সূচিত হয়েছিলো, স্বাধীনতার এতোকাল পরেও বাঙালি জীবনে সেসব প্রত্যাশার বাস্তবায়ন হলো না। এই ট্র্যাজিক বাস্তবতাই বাংলাদেশের কবিতাকে তার মৌল স্বভাবে বারবার জাগ্রত করেছে। ফলে, আমাদের কবিতার রক্তাক্ত ও সংগ্রামী পথচলা এখনো অব্যাহত। বর্তমানে কাব্যভাষা ও রূপকল্পে বাংলাদেশের কবিতা যে সম্পন্নতা অর্জন করেছে, তার ফলে বাঙালির শিল্প-সংগ্রামের চরিত্র হয়ে উঠেছে আরো তীব্র, তীক্ষ, গভীর ও ব্যঞ্জনাময়।

বিভি/ইই/এমএইচকে

You may also like

করোনায় ৭ জনের মৃত্যু, নতুন শনাক্ত ৬১৯ জন

করোনাভাইরাসের সংক্রমণে ২৪ ঘণ্টায় দেশে আরও সাত জন