মহাশ্বেতা দেবী, ৯২তম জন্মদিনের শুভেচ্ছা…

অনন্য কথাসাহিত্যিক ও মানবাধিকারকর্মী মহাশ্বেতা দেবীর ৯২তম জন্মবার্ষিকী আজ। ১৯২৬ সালের ১৪ জানুয়ারি তাঁর জন্ম। ব্রিটিশ ভারতের ঢাকা শহরেই এক সাহিত্যিক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন এই মহীয়সী।

পিতা মণীষ ঘটক ছিলেন ‘কল্লোল’ সাহিত্য আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত খ্যাতনামা কবি ও ঔপন্যাসিক। তিনি অধিকাংশ লেখা লিখতেন ‘যুবনাশ্ব’ ছদ্মনামে। মহাশ্বেতা দেবীর কাকা ছিলেন বিশিষ্ট চলচ্চিত্র পরিচালক ঋত্বিক ঘটক এবং মা ধরিত্রী দেবীও ছিলেন বিশিষ্ট লেখক ও সমাজকর্মী। মহাশ্বেতা দেবীর ভাইয়েরা বিভিন্ন ক্ষেত্রে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখে গেছেন। তাদের মধ্যে- শঙ্খ চৌধুরী ছিলেন বিশিষ্ট ভাস্কর এবং শচীন চৌধুরী ছিলেন “দি ইকোনমিক অ্যান্ড পলিটিক্যাল উইকলি অফ ইন্ডিয়া” পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা-সম্পাদক।

মহাশ্বেতা দেবীর বিদ্যালয়-শিক্ষা শুরু হয়েছিল ঢাকা শহরেই। ভারত বিভাজনের পর তিনি ভারতের পশ্চিমবঙ্গে স্থায়ী হন। এরপর তিনি শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রতিষ্ঠিত বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠভবনে ভর্তি হন এবং সেখান থেকে স্নাতক উত্তীর্ণ হন। পরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্য বিভাগে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেন মহাশ্বেতা দেবী।

মহাশ্বেতা দেবী ১০০টিরও বেশি উপন্যাস এবং ২০টিরও বেশি ছোটোগল্প সংকলন রচনা করেছেন। সেই সব রচনার মধ্যে অনেকগুলি অন্যান্য ভাষায় অনূদিত হয়েছে। তার প্রথম উপন্যাস “ঝাঁসির রানি” (লক্ষ্মীবাই) এর জীবনী অবলম্বনে রচিত। এটি প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৫৬ সালে। এই উপন্যাসটি রচনার আগে তিনি ঝাঁসি অঞ্চলে গিয়ে তাঁর রচনার উপাদান হিসেবে স্থানীয় অধিবাসীদের কাছ থেকে তথ্য ও লোকগীতি সংগ্রহ করে এনেছিলেন।

১৯৬৪ সালে মহাশ্বেতা দেবী বিজয়গড় কলেজে (কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক অনুমোদিত কলেজ) শিক্ষকতা শুরু করেন। সেই সময় বিজয়গড় কলেজ ছিল শ্রমিক শ্রেণির ছাত্রীদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এই সময় মহাশ্বেতা দেবী একজন সাংবাদিক ও একজন সৃজনশীল লেখক হিসেবেও কাজ চালিয়ে যান। তিনি পশ্চিমবঙ্গের লোধা ও শবর উপজাতি, নারী ও দলিতদের নিয়ে পড়াশোনা করেন। তাঁর প্রসারিত কথাসাহিত্যে তিনি প্রায়শ:ই ক্ষমতাশালী জমিদার, মহাজন ও দুর্নীতিগ্রস্ত সরকারি আধিকারিকদের হাতে উপজাতি ও অস্পৃশ্য সমাজের অকথ্য নির্যাতনের চিত্র অঙ্কন করেছেন। লেখনীর একপর্যায়ে তিনি রচনা করেন ঔপনিবেশিক শক্তি ও সমকালীন সামন্তবাদী সমাজ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে মুন্ডা জনগোষ্ঠীর বিদ্রোহ সংবলিত ‘অরণ্যের অধিকার’ (১৯৭৯)।

তাঁর অনুপ্রেরণার উৎস সম্পর্কে মহাশ্বেতা নিজেই লিখেছেন এভাবে- “আমি সর্বদাই বিশ্বাস করি যে, সত্যকারের ইতিহাস সাধারণ মানুষের দ্বারা রচিত হয়। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে সাধারণ মানুষ যে লোককথা, লোকগীতি, উপকথা ও কিংবদন্তীগুলি বিভিন্ন আকারে বহন করে চলেছে, তার পুনরাবির্ভাবের সঙ্গে আমি ক্রমাগত পরিচিত হয়ে এসেছি। … আমার লেখার কারণ ও অনুপ্রেরণা হল সেই মানুষগুলি যাদের পদদলিত করা হয় ও ব্যবহার করা হয়, অথচ যারা হার মানে না। আমার কাছে লেখার উপাদানের অফুরন্ত উৎসটি হল এই আশ্চর্য মহৎ ব্যক্তিরা, এই অত্যাচারিত মানুষগুলি। অন্য কোথাও আমি কাঁচামালের সন্ধান করতে যাব কেন, যখন আমি তাদের জানতে শুরু করেছি? মাঝে মাঝে মনে হয়, আমার লেখাগুলি আসলে তাদেরই হাতে লেখা।”

মহাশ্বেতাদেবী সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার (বাংলায়), জ্ঞানপীঠ পুরস্কার ও র‌্যামন ম্যাগসাইসাই পুরস্কারসহ একাধিক সাহিত্য পুরস্কার এবং ভারতের চতুর্থ ও দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অসামরিক সম্মান যথাক্রমে পদ্মশ্রী ও পদ্মবিভূষণ পেয়েছিলেন। পশ্চিমবঙ্গ সরকার তাকে রাজ্যের সর্বোচ্চ অসামরিক সম্মান বঙ্গবিভূষণে ভূষিত করেছিল।

মহাশ্বেতা দেবী আজীবন সংগ্রামী চিন্তার চর্চা করেছেন। সাহিত্যচর্চার মধ্য দিয়ে তিনি জীবনচর্চা করে গেছেন। যদিও তিনি কোনো রাজনৈতিক দলের সক্রিয় কর্মী নন। পারিবারিকভাবে এক সাহিত্যবেষ্টিত পরিমন্ডলে বড় হওয়ার ফলে সাহিত্যকেই জীবনে কর্ম হিসেবে বেছে নিয়েছেন। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাকে দু’টি কবিতা উপহার দিয়েছিলেন।

১৯৪৭ সালে বিশিষ্ট নাট্যকার এবং কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য বিজন ভট্টাচার্যের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাদের সংসার-জীবন ছিল দারিদ্র্য-পরিবেষ্টিত, এসময়ে মহাশ্বেতা দেবী রং, সাবান, রঙের গুঁড়া ফেরি করেন, ছাত্র পড়ানো শুরু করেন। ১৯৪৮ সালে তার একমাত্র পুত্র নবারুণ ভট্টাচার্যের জন্ম হয়। তাদের সংসার-জীবন পনেরো বছরের বেশি টেকেনি।

পরবর্তীকালে তিনি লেখাকেই পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন। ঝাঁসীর রানী, অরণ্যের অধিকার ছাড়াও তার উল্লেখযোগ্য বইয়ের মধ্যে রয়েছে- ঐতিহাসিক পটভূমিকায় খুদাবক্স ও মোতির প্রেমের কাহিনী নিয়ে রচিত ‘নটী’, লোকায়ত  নৃত্য-সংগীতশিল্পীদের নিয়ে ‘মধুরে মধুর’, সার্কাসের শিল্পীদের বৈচিত্র্যময় জীবন নিয়ে ‘প্রেমতারা’, ‘যমুনা কী তীর’, ‘তিমির লগন’, ‘রূপরাখা’, ‘বায়োস্কোপের বাক্স’ ইত্যাদি। ষাটের দশকের মাঝামাঝিতে লেখা ‘আঁধার মানিক’, ‘কবি বন্দ্যঘটী গাঞির জীবন ও মৃত্যু’, ‘হাজার চুরাশির  মা’।

১৯৬২ সালে বিজন ভট্টাচার্যের সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে। সংসার ভেঙে গেলেও ছেলের জন্য খুব ভেঙে পড়েছিলেন। সেসময় তিনি অতিরিক্ত ঘুমের ওষুধ খেয়ে আত্মহত্যা করতেও গিয়েছিলেন, চিকিৎসকদের চেষ্টায় বেঁচে যান। ‘হাজার চুরাশির মা’ উপন্যাসে তিনি ছেলে থেকে বিচ্ছিন্ন হবার যন্ত্রণার প্রকাশ ঘটিয়েছিলেন।

এরপর তিনি অসিত গুপ্তকে বিয়ে করেন ১৯৬৫ সালে,  কিন্তু সেই সংসারও ১৯৭৬ সালে ভেঙে যায়। নিঃস্ব জীবন, বিচ্ছেদ-বিরহ-বেদনায় তিনি নিজেকে সঁপে দেন লেখা এবং শিক্ষার ব্রতে।

তিনি আদিবাসীদের নিয়ে প্রচুর ছোটগল্প লিখেছেন, গল্পগ্রন্থের মধ্যে উল্লেখ্য – শালগিরার ডাকে (১৯৮২), ইটের পরে ইট (১৯৮২), হরিরাম মাহাতো (১৯৮২), সিধু কানুর ডাকে (১৯৮৫) প্রভৃতি। এই সব গল্প-উপন্যাসে তিনি সাম্রাজ্যবাদী শক্তির সামরিক নিষ্পেষণের বিরুদ্ধে যেমন আদিবাসী প্রতিবাদী চরিত্র চিত্রিত করেছেন, তেমনি এদেশীয় সামন্ততান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার শোষণের প্রতি প্রতিবাদ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কণ্ঠস্বরে তুলে ধরেছেন।

মহাশ্বেতা দেবীর বিশেষত্ব এই যে, বাংলা উপন্যাসে দলিত শ্রেণির মানুষজনের সর্বাধিক উপস্থিতি ঘটিয়েছেন। তিনি বাংলা সাহিত্যে সর্বাধিক আদিবাসী জীবনকেন্দ্রিক উপন্যাস রচনা করে ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন। তার সাহিত্যকর্ম ইংরেজি, জার্মান, জাপানি, ফরাসি এবং ইতালীয় ভাষায় অনুবাদ হয়েছে। এছাড়া, অনেকগুলো বই ভারতীয় বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে। যেমন – হিন্দি, অসমীয়া, তেলেগু, গুজরাটি, মারাঠি, মালয়ালম, পাঞ্জাবি, ওড়িয়া এবং আদিবাসী হো ভাষা।

বিশাল সাহিত্যাকাশ ছেড়ে মহাশ্বেতা দেবীর দূর অজনায় পাড়ি জমান ২০১৬ সালের ২৮ জুলাই। কীর্তিমানের মৃত্যু নাই – নিজ কর্মে তারই চিহ্ন রেখে গেছেন পাঠক, ভক্ত হৃদয়ে।

নাসরীন গীতি, ঢাকা।

You may also like

জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী শাম্মী আক্তারের দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী আজ

গানের আকাশের উজ্জ্বল নক্ষত্র শাম্মী আক্তার, বছর দুই