শব্দের বিকৃতিতে ভাষার দূষণ; দায় কার, কত?

নানা বর্ণের অর্থহীন ব্যবহারে বাংলা ভাষার দূষণ চলছেই

“শুভ ইসলাম”

নেহা, সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী। করোনাকালীন শিক্ষা ব্যবস্থায় অনলাইন ক্লাসে অভ্যস্ত। স্বভাবতই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বন্ধুদের সাথে আড্ডা নিয়মিত হয়। রাতে ঘুমানোর আগে নেহা তার এক বান্ধবীকে ফেসবুক মেসেঞ্জারে ‘gdn8’ লিখে বিদায় নেয়। অথচ, শব্দটি “gdn8″ না হয়ে “good night” হতো। এতো গেলো ইংরেজি ভাষার যথেচ্ছ ব্যবহার।  

বাংলা ভাষার আঞ্চলিকতা নিয়ে মজার ছলে আমরা শব্দের সংক্ষিপ্তকরণ করতে গিয়ে ভাল্লাগসে, মাইরালা, সি-রাম – এরকম নানাবিধ শব্দ ব্যবহার করছি হরহামেশাই। ভাষার এরকম বিকৃতি অহরহ আমাদের সামনে ঘটছে। নেই নিয়ম-নীতি, ব্যাকরণগত শুদ্ধতা কিংবা শব্দ সংক্ষেপকরণ নিয়মের তোয়াক্কা।

ভাই অথবা বন্ধুকে বলি, ‘হাই ব্রো’। ‘ভাই’ হয়ে যায় ‘ব্রো’! কত সহজে মনের ভাব প্রকাশ করছি! আর বাংলায়, তোমরা থেকে ‘তোম্রা, ‘ব্যাপক’, ‘অস্থির’, ‘ক্যারে’, ‘লুল’ ইত্যাদি! এরকম অসংখ্য শব্দকে আমরা প্রতিটি কথায় কথায় ব্যবহার করছি যত্রতত্র। প্রমিত উচ্চারণ তো বাদই, যার যার আঞ্চলিক শব্দটারও সঠিক ব্যবহার করছি না আমরা। বিশেষ করে আমাদের কিশোর-কিশোরী ও তরুণ-তরুণীদের মধ্যে এই প্রবণতা বেশি চোখে পড়ে।

এখনকার তরুণ সমাজের একটা অংশ শুদ্ধ শব্দচয়ন যেন ভুলেই গেছে। তারা বাংলার সংগে ইংরেজি, হিন্দী মিলিয়ে এমন কিছু শব্দ প্রয়োগ করেন যা অনেক ক্ষেত্রে শ্রুতিমধুর তো নয়ই, বরং অশ্রাব্য বলেই গণ্য হয়।

ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত ছবি

১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর থেকেই পাকবাহিনীর তৎপরতা শুরু হয়, বাঙালির মুখ থেকে মায়ের ভাষাকে মুছে দিতে। কিন্তু প্রতিবাদী বাঙালি ফুঁসে উঠে পাক সরকারের এই অপতৎপরতায়। এর চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি। মায়ের ভাষাকে রাষ্ট্র ভাষায় প্রতিষ্ঠা করতে জীবন দিয়েছেন রফিক, শফিক, জব্বার, বরকত, শফিউরসহ আরও অনেকে। আমরা রক্তের বিনিময়ে পেয়েছি বাংলা ভাষা। পাকিস্তান সরকার ১৯৫৬ সালে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দিতে বাধ্য হয়েছিল। ভাষা আন্দোলন থেকেই জাতীয় চেতনা জাগ্রত হয় এবং এরই ফলস্বরূপ ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে এ দেশ স্বাধীন হয়।

পরবর্তীতে ভাষার মর্যাদা সমুন্নত রাখার লড়াইয়ের এই দিনটিকে বিশ্বও স্বীকৃতি দেয় “আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস” হিসেবে। অথচ আমরা এখন বাংলাভাষার মর্যাদা সমুন্নত রাখতে পারছি না। অহরহ শব্দের বিকৃত উচ্চারণ করছি। প্রমিত উচ্চারণ তো করছিই না। এর চর্চাও অনেক সীমিত।

মিঠুন মিয়া, সহযোগী অধ্যাপক, গণ যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, জ.বি.

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মিঠুন মিয়া বলেন, “ভাষার বিকৃতি মানে মা’কে অপমান করার সামিল। গণমাধ্যম সামাজিকীকরণের কাজ করছে। কিন্তু গণমাধ্যমে প্রতিনিয়ত ভাষার বিকৃতি সাধিত হচ্ছে। সংবাদপত্রে ভাষার প্রয়োগের নিয়ম নীতি মানা, গণমাধ্যম কর্মীদের অধিক সচেতন ও দায়িত্ববান হওয়া, ভাষার বিকৃতি করলে সংশ্লিষ্ট গণমাধ্যমকে শাস্তির আওতায় আনা দরকার”।

সেই সাথে ভাষার বিকৃতি রোধে সরকারের আলাদা প্রাতিষ্ঠানিক নজরদারির ওপর জোর দেন তিনি।

তপন মাহমুদ লিমন, সহকারী অধ্যাপক, সাংবাদিকতা বিভাগ, স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি

 

 

 

স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক তপন মাহমুদ লিমন বলেন, “ভাষার বিকৃতি রোধে গণমাধ্যম কর্মীদের অধিক সচেতন হতে হবে। কারণ, টিভি, রেডিও,পত্রিকা, অনলাইন সামাজিক যোগযোগ মাধ্যমের কর্মীদের সমন্বয়ে মূলত মিডিয়া গঠিত। তাই ভাষার বিকৃতি রোধে মিডিয়া কর্মীরদের নিজ থেকে সচেতন হয়ে সঠিক ভাষা প্রয়োগ করতে হবে। শুধু ফ্রেব্রুয়ারিকে কেন্দ্র করে ভাষা নিয়ে কাজনা, সারা বছর সমানভাবে কাজ করার পরামর্শও দেন তিনি”।

বাংলা ভাষাকে সঠিকভাবে না শেখাটাও ভাষা বিকৃতির একটি কারণ বলে মনে করেন অধ্যাপক লিমন।

 

 

 

 

ভাষা বিকৃতির প্রশ্নে প্রথমেই বিশেষ একটি শ্রেণী নজর কাড়ে- রেডিও জকি বা আরজে। প্রতিনিয়ত বাংলাকে ইংরেজির মত করে বলার অসৎ প্রতিযোগিতায় লিপ্ত এই শ্রেণী। একদিকে যেমন বোঝা যায় না তারা কি বাংলা না ইংরেজি বলে?

 

দর্শক আবিষ্কার করে ভাষার বিকৃত উপস্থাপনা। এতে প্রভাবিত হচেছ তরুণ সমাজ। বলছে, কাইলকা পরীক্ষা, কিছুই পড়িনাইক্যা, আমারে তুইল্যা নাও, ভাল্যাগসে, মাইরালা’র মত শব্দ।

রেডিও টুডের আরজে টুটুল বলেন, “শুধুমাত্র রেডিও আরজের উপর ভাষা বিকৃতির দায়ভার দিলে চলবে না। আমাদের ভাষা শিক্ষার গোড়ার দিকে নজর দিতে হবে”। পাল্টা প্রশ্ন ছোঁড়েন তিনি, “আমরা সামগ্রিকভাবে স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে কতটুকু সঠিকভাবে বাংলা ভাষা শিক্ষা দিতে পারছি? ইংরেজি মাধ্যমের বিদ্যালয়গুলোতে কতটুকু বাংলা শেখানো হচ্ছে? তাই সামগ্রিকভাবে যখন আমরা হযবরল বাংলা শেখা ব্যাক্তিরাই রেডিও টেলিভিশনের উপস্থাপনায় বসছি, তখন কিভাবে আমরা শুদ্ধ বাংলা আশা করতে পারি”?

পাশাপাশি তিনি যোগ করেন, “আরজে জগতে অনেক স্বনামধন্য আরজে আছে মানুষ যাদের গ্রহণ করেছে, এবং তাদের কাছ থেকে মানুষ শিখছেও”।

 

 

আরজে টুটুল, রেডিও টুডে

আরজে উদয়, জাগো এফএম

 

এ বিষয়ে জাগো এফএমের আরজে উদয় বলেন, ভাষার বিকৃতি আসলে কোনভাবেই কাম্য নয়, এক্ষেত্রে আরজেরা কিছু কিছু ক্ষেত্রে দায় এড়াতে পারে। কেউ কেউ নিজস্ব স্টাইলকে ফুটিয়ে তুলতে “হিংবাংলিশ” ভাষা ব্যবহার করে থাকে। শ্রোতারাও এভাবে শুনতে চায় না বলে জানান তিনি।

 

 

 

 

জাতীয় দৈনিক দেশ রূপান্তর পত্রিকার ডেপুটি এডিটর মাহবুব মোর্শেদ এ বিষয়ে ভিন্ন মত পোষণ করেন। তিনি বলেন, “তথাকথিত যারা ভাষা বিকৃতি নিয়ে গলাবাজি করে তাদের অবশ্যই ভাষার পরিবর্তনের ইতিহাস জানতে হবে। কারণ ভাষা বহমান নদীরমত পরিবর্তনশীল। সময়ের বিবর্তনে ভাষার বিকৃতিও একপ্রকার পরিবর্তনেরই সামিল। আরজেদের ভাষা বিকৃতির প্রশ্নে তিনি বলেন, রেডিওতে নির্দিষ্ট একটা শেণীকে টার্গেট করে উপস্থাপনা করা হয়। সেক্ষেত্রে নিজস্ব স্টাইলকে প্রস্ফুটিত করতে অনেক সময় বাংলার বিকৃতি সাধন করে থাকে”। ভাষার বিকৃতি রোধে গণমাধ্যম কর্মীদের আরোও দায়িত্বশীল হওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

মাহবুব মোর্শেদ, ডেপুটি এডিটর, দৈনিক দেশ রূপান্তর

২০১৪ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্ট সাইনবোর্ড, বিলবোর্ড, ব্যানার, গাড়ির নম্বরপ্লেট ও বিভিন্ন দপ্তরের নামফলকে বাংলা ব্যবহারের নির্দেশনা দেয়।  এছাড়া, ভাষার বিকৃতি রোধে ১৯৮৭ সালের বাংলা ভাষা প্রচলন আইনসহ আছে সরকারি অনেক বিধিনিষেধ। কিন্তু এসব আদেশ, আইন ও বিধিনিষেধের বাস্তবায়ন দেখা যাচ্ছে না তেমন একটা। সর্বত্র বাংলা ভাষার দূষণ চলছেই।

ভাষাদূষণের ব্যাপারে ইংরেজি দৈনিক ডেইলি স্টার-এর এক সাক্ষাৎকারে ভাষাসংগ্রামী আহমদ রফিক বলেছিলেন, “ভাষার বিকৃতি ও দূষণ চলছে বহুদিন ধরে। এর মূল কারণ ইংরেজি ভাষায় শিক্ষিত হয়ে দেশ শাসন করছি, নিজ ভাষা অবহেলিত হচ্ছে। বিষয়কে একটি সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করে সমাধানের চেষ্টা না করা পর্যন্ত দূষণ বিকৃতি চলতেই থাকবে”।

ভাষা সৈনিক আহমেদ রফিক

এই সংবাদপত্রে দেয়া সাক্ষাৎকারে ভাষাবিদ অধ্যাপক সৈয়দ মঞ্জুরুল ইসলাম বলেন, “আদালত শুধু নির্দেশনাই দিতে পারেন। সেটি বাস্তবায়নের সঙ্গে অনেক প্রতিষ্ঠান জড়িত। ভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রে ওইসব প্রতিষ্ঠান সচেতন না হলে আদালতের আদেশ তো উপেক্ষিত থাকবেই। নিয়মনীতির চেয়ে বড় প্রয়োজন ভাষা নীতি। এছাড়া দরকার নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ। এ কর্তৃপক্ষ হতে হবে সিটি করপোরেশন, মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট, বিশ্ববিদ্য্যালয়ের শিক্ষক, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রসহ যারা ভাষা নিয়ে কাজ করছেন, সবার সহযোগিতা নিয়ে এ কর্তৃপক্ষ কাজ করবে”।

উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত বাংলার ব্যবহার থাকলেও বিশ্ববিদ্যালয়, ডাক্তারি বা ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষার সর্বোচ্চ স্তরগুলোতে বাংলা ভাষার ব্যবহার একেবারেই কম। বেশিরভাগ বই ইংরেজিতে হওয়ায় বাধ্য হয়ে শিক্ষার্থীরাও ইংরেজিতে উচ্চশিক্ষা নিচ্ছেন এটিও বাংলা ভাষা সঠিকভাবে না শেখার গুরুত্বপূর্ণ কারণ বলে মনে করেন শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা।

বিশ্বব্যাংক পৃথিবীর নিম্ন আয়ের দেশগুলোর শিক্ষা পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে দারিদ্র্যের বিভিন্ন সূচকের সঙ্গে ‘শিক্ষা দারিদ্র্য’ নামে একটি সূচক যুক্ত করেছে। শিক্ষা দারিদ্র্যের মাপকাঠি ধরা হয়েছে ১০ বছর বয়সে বা প্রাথমিক শিক্ষার সমাপ্তিতে কত শতাংশ মাতৃভাষায় (অথবা দেশের প্রধান ব্যবহারিক ভাষায়) নির্ধারিত পড়া ও লেখার দক্ষতা আয়ত্ত করতে পারে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে ৫৩ শতাংশ ছেলেমেয়ে এই দক্ষতা অর্জন করে না। বাংলাদেশের এই হার ৫৬ শতাংশ। সরকারি উদ্যোগে শিক্ষার্থীর দক্ষতা যাচাইয়ের জরিপ থেকে এই হার নিরূপণ করা হয়েছে। (মনজুর আহমেদ, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক, প্রথম আলো, ১৭ ফ্রেবুয়ারী ২০২১)

বাংলা একাডেমীর মহাপরিচালক হাবিবুল্লাহ সিরাজী বলেন, যেহেতু কোর্টের নির্দেশনা আছে তাই নির্দেশ বাস্তবায়ন ও ভাষার বিকৃতি রোধে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে আরো দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।

ভাষাদূষণ রোধে আইন তৈরি করে বেতার ও টেলিভিশনে প্রমিত বাংলার ব্যবহার নিশ্চিত এবং ভাষায় বিদেশি শব্দের অকারণ মিশ্রণ দূর করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ; দেশি টেলিভিশন চ্যানেল এবং দেশি বেতার ও টেলিভিশন নিয়ন্ত্রণ; বিদ্যালয়ে বাধ্যতামূলকভাবে প্রমিত বাংলা ভাষার কোর্স চালু এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের পঠন প্রবর্তনের উদ্যোগ; সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ভাষার দূষণ রোধে বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশনস রেগুলেটরি কমিশনের ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে ভাষার তথাকথিত আধুনিক পরিবর্তন বা বিকৃতি কিছুটা হলেও রোধ করা যেতে পারে।

পরিবর্তনশীলতাই ভাষার ধর্ম, এতেই ভাষা সমৃদ্ধ হয়। কিন্তু আধুনিকতার নামে ভাষার বিকৃতি কখনোই কাম্য নয়। ভাষার মাধুর্য, সৌন্দর্য ও ব্যাকরণগত সামঞ্জস্যতা রক্ষা করে পরিবর্তত হওয়াটা যেমন জরুরি তেমনি পরিবর্তিত ভাষাকে নিয়ে যেন কোন বিতর্কের সৃষ্টি না হয়, এমনটিই দাবি রক্তার্জিত বাংলা  ভাষাভাষীদের।

বিভি/এইচএস/এমএইচকে/এনজি

You may also like

করোনায় ৭ জনের মৃত্যু, নতুন শনাক্ত ৬১৯ জন

করোনাভাইরাসের সংক্রমণে ২৪ ঘণ্টায় দেশে আরও সাত জন