বীর মুক্তিযোদ্ধা সাদেক হোসেন খোকার প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী আজ

৪ নভেম্বর ২০১৯ থেকে ৪ নভেম্বর ২০২০। যেন চোখের পলকে পার হলো ১ টি বছর। তিনি নেই, নেই তার পদচারণা। নেই একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার কন্ঠে দেশ গড়ার দীপ্ত শপথ। কিংবা বলিষ্ঠ এক রাজনীতিবিদের সংগ্রামী পথচলা। তবু দেশজুড়ে ঠিকই ছড়িয়ে আছে হাজারো মুক্তিযোদ্ধা, রাজনৈতিক নেতাকর্মী-সমর্থক, পেশাজীবী, ক্রীড়ানুরাগী, বিশিষ্টজনসহ দলমত নির্বিশেষে সাধারণ মানুষের শ্রদ্ধা,ভালোবাসা। দর্শক, বলছিলাম একাত্তরের গেরিলা যোদ্ধা, অবিভক্ত ঢাকার সাবেক মেয়র, বরেণ্য রাজনীতিবিদ সাদেক হোসেন খোকার কথা।

৭ নভেম্বর ২০১৯, বিমানবন্দর থেকে জাতীয় সংসদ, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে নয়াপল্টন কিংবা টিকাটুলি থেকে জুরাইন কবরস্থান-সবখানেই লাখো শোকার্ত মানুষের স্রোত। কেউ এসেছিলেন ৭১ এর এক অকুতোভয় যোদ্ধাকে শেষ বিদায় জানাতে, কেউ তার রাজনৈতিক সহকর্মীকে আবার কেউবা তার প্রিয় নেতাকে হারানোর বুকভরা বেদনায়।

মৃত্যুর পর কাউকে দেয়ার আর কিছুই থাকে না। নিথর দেহের প্রতি যে হৃদয় নিংড়ানো ভালোবাসা সেটি যে একেবারেই নি:স্বার্থ, অন্তরের অন্ত:স্থল থেকে বলার অপেক্ষা রাখে না। প্রায় সব শ্রেনী পেশার মানুষের কাছে এক অনি:শেষ ভালোবাসার নাম সাদেক হোসেন খোকা। কেন এতো জনপ্রিয় ছিলেন ? কারণ, তিনি জানতেন ভালোবাসতে, জানতেন ভালোবাসা বিলাতে। তাইতো চিরবিদায়ে পথে পথে শোকার্ত মানুষের ঢল। পুরো রাজধানী জুড়ে প্রিয় অভিভাবকের শেষ যাত্রায় আপনজনের মতো আহাজারি। শেষ কবে কে দেখেছে এমন দৃশ্য।

জীবনের সব লড়াইয়ে সামনে থাকা সাদেক হোসেন খোকা উণসত্তুরের গণ-অভ্যুত্থানে তরুন-যুবাদের নেতা হিসাবে ছিলেন অগ্রভাগে। দেশমাতৃকার মুক্তি সংগ্রামেও লড়েছিলেন সর্বশক্তিতে। ১৯৭১ এর শেষদিকে তৎকালীন তথ্য অধিদপ্তর, পশ্চিম পাকিস্তান নির্বাচন কমিশন অফিস, বিমান বাহিনীর রিক্রুর্টিং অফিস আর পিলখানার গেটে দু:সাহসিক অভিযান চালিয়েছিলো গেরিলা যোদ্ধারা। পাকবাহীনির বুকে কাঁপন ধরিয়ে দেয়া সেই বিধ্বংসী অভিযানের নেতৃত্বে ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা সাদেক হোসেন খোকা।

১৯৭৭ সালে তৎকালীন ঢাকা পৌরসভার কমিশনার নির্বাচিত হন। নব্বইয়ের দশকে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে প্রথম সারিতে ছিলেন সাদেক হোসেন খোকা। ৯১ এর নির্বাচনে বিপুল ভোটে প্রথম বারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। দায়িত্ব পান যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর। ৫ বছরে দেশে খেলাধুলার মানোন্নয়ন ও সম্প্রসারনে অসামান্য ভূমিকা রাখেন ক্রীড়া অন্ত:প্রাণ খোকা। ১৯৯৬ সালে আবারো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এরপর তিনি ঢাকা মহানগর বিএনপির আহবায়কের দায়িত্ব পান। সে সময়ে যাত্রাবাড়িতে এক প্রতিবাদ মিছিলে নেতৃত্ব দিতে গিয়ে পুলিশের গুলিতে রক্তাক্ত হয়েও রাজপথ ছাড়েননি এই ত্যাগী নেতা। ২০০১ সালে চতুর্থ বারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে মৎস্য ও পশুসম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দক্ষতার সাথে পালন করেন।

২০০২ সালের ২৫ এপ্রিল অনুষ্ঠিত নির্বাচনে অবিভক্ত ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের মেয়র নির্বাচিত হন তিনি। দল-মতের উর্ধ্বে উঠে নিরলসভাবে কাজ করে নগর পরিসেবায় নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। সম্পূর্ন বেসরকারি অর্থায়নে নির্মিত গুলিস্তান -যাত্রাবাড়ি ফ্লাইওভারের নির্মাণ কাজ শুরু হয়েছিলো তার সময়ে। মুক্তিযোদ্ধা ও জাতীয় পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নামে সড়ক ও বিভিন্ন স্থাপনার নামকরণ করে সাদেক হোসেন খোকা এক অনন্য নজির স্থাপন করেন। আমৃত্যু বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করা এই নেতা ছিলেন- কর্মীবান্ধব। সুখে -দু:খে নেতা-কর্মীদের পরিবারের পাশেও দাঁড়াতেন সবার আগে।

জীবনের শেষভাগে মরণব্যাধি ক্যান্সারের সাথেও লড়তে হয়েছে আজন্ম সংগ্রামী মানুষটিকে। চিকিৎসার জন্য যেতে হয়েছে সূদুর আমেরিকায়। প্রিয় মাতৃভূমিকে স্বাধীন করতে জীবনবাজি রাখা এই যোদ্ধাকে শেষ পর্যন্ত ভৌগোলিক সীমানার বাইরেই শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করতে হয়। তবে দেশের মাটিতে ফিরে আসে সাদেক হোসেন খোকার প্রাণহীন দেহ। বরেণ্য এই রাজনীতিবিদের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে নিভে গেলো এদেশের রাজনৈতিক আকাশের এক উজ্জ্বল তারা। তবে তার অনুকরনীয় কাজের মাঝেই বেঁচে থাকবেন আপামর জনতার এই ভালোবাসার মানুষটি।

 

You may also like

বাঁধাকপি বিদেশে রফতানি, খুশি চাষীরা

বাংলাদেশের বাঁধাকপি এখন বিদেশে রফতানি হচ্ছে। এরই মধ্যে