চলেগেলেন বরেণ্য আইনজীবি ব্যারিস্টার রফিক-উল হক

চলেগেলেন বরেণ্য আইনজীবি ব্যারিস্টার রফিক-উল হক। রাজধানীর একটি একটি হাসপাতালে নিভির পর্যবেক্ষেণে ছিলেন বর্ণাঢ্য জীবনের অধিকারি সাবেক এই এটর্নি জেনারেল। আইনজীবী রফিক-উল সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আসেন ওয়ান ইলাভেনের পর। শেখ হাসিনা এবং খালেদা জিয়ার পক্ষে আইনি লড়াই তাকে বিপুল পরিচিতি এনে দেয়। অসীম সাহসিকতার সঙ্গে তিনি রাজনীতিবিদদের পাশে এসে দাঁড়ান। অর্থ উপার্জন করেছেন দুই হাতে। কিন্তু তেমন কিছুই রাখেননি নিজের কাছে। সব দান করেছেন চিকিৎসা সেবায়। আইনজীবী হিসেবে মামলা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি প্রতিষ্ঠান আর কর্পোরেট হাউজের কাছে অনেক আগে থেকেই পরিচিত থাকলেও দেশের সর্বসাধারনের কাছে তিনি পরিচিতি পান এক এগারর সময়। সেনা সমর্থিত তত্বাবধায়ক সরকারের রোষানলে শেখ হাসিনা ও বেগম খালেদা জিয়া কারাবন্দি হলে তাদের আইনী সহায়তায় এগিয়ে আসেন ব্যারিষ্টার রফিকুল হক। দুই নেত্রীকে বিনাপারিশ্রমিকে আইনী সহায়তার পাশাপাশি গনতন্ত্র ফিরিয়ে দেয়ার দাবিতে তিনি সোচ্চার হন। এভাবে দেশবাসীর কাছে শ্রদ্ধার আসনে আসীন হন ব্যরিস্টার রফিক উল হক।

১৯৩৫ সালের ২ নভেম্বর অবিভক্ত ভারতের কোলকাতায় জন্ম নেন ব্যারিস্টার রফিক উল হক। বাবা মুমিন উল হক ছিলেন চিকিৎসক। এক সময় চব্বিশ পরগনায় মিউনিসিপ্যালিটির চেয়ারম্যান ছিলেন। মায়ের নাম নুরজাহান বেগম। রফিকুল হকের পড়াশুনা শুরু চেতলা হাইস্কুলে। তারপর ইসলামিয়া কলেজ। থাকতেন বেকার হোস্টেলে। ১৯৫৫ সালে কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক এবং ১৯৫৭ সালে দর্শণে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৫৮ সালে এলএলবি পাশ করে দুই বছর পর শুরু করেন আইন পেশা। ১৯৬২ সালে যুক্তরাজ্য থেকে বার এট ল করেন। ১৯৬৫ সালে পাকিস্তান সুপ্রিম কোর্টে আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত হোন। আর ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালতের আপিল বিভাগে আইনজীবি হিসেবে যোগদান করেন। দীর্ঘ ছয় দশক তিনি আইন পেশার সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। ছাত্রজীবনে তার সহপাঠিদের মধ্যে ছিলেন ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রনব মুখার্জি।ছাত্রাবস্থায় যুব কংগ্রেস পশ্চিমবঙ্গের নেতৃত্ব দেন রফিক উল হক। তখন পুরো ভারতের সভাপতি ছিলেন ইন্দিরা গান্ধী। যদিও পরে রাজনীতি থেকে নিজেকে দুরে রাখেন।

রফিক উল হকের পিতাসহ পরিবারের বেশিরভাগ সদস্যই ছিলেন চিকিৎসক। কিন্তু দাদীর ইচ্ছায় আইন পেশায় আসেন তিনি। সুদীর্ঘ এই পথচলায় অনেক গুরুত্বপূর্ণ আইন প্রণয়নে ভূমিকা রেখেছেন রফিক উল হক। কাজ করেছেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ও সাবেক রাষ্ট্রপতি এইচএম এরশাদের সাথে। তার জুনিয়রদের মধ্যে চার জন দেশের প্রধান বিচারপতি ছিলেন। দেশের বিচার বিভাগের ভাবমূর্তি রক্ষার জন্য ব্যরিস্টার রফিক সব সময়ই সোচ্চার ছিলেন। সত্য কথা বলতে তিনি কখনো কুন্ঠাবোধ করেননি। সবসময়ই দেশের রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান চেয়েছেন বর্ষিয়ান এই আইনজীবি। তাই দুই নেত্রীকে একসাথে বসানোর চেষ্টা ছিল তার, কিন্তু না পারায় আক্ষেপও ছিল। ১৯৯০ সালের ৭ই এপ্রিল থেকে ১৭ই ডিসেম্বর পর্যন্ত রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন রফিক-উল হক। কিন্তু কোনো সম্মানী নেননি। পেশাগত জীবনে তিনি কখনো কোনো রাজনৈতিক দল করেননি। তবে, নানা সময়ে রাজনীতিবিদরা সবসময় তাঁকে পাশে পেয়েছেন।

২০১১ সালে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান তার স্ত্রী ডা. ফরিদা হক। আর একমাত্র ছেলে ব্যারিস্টার ফাহিমুল হকও আইন পেশায় আছেন। আর্তমানবতার সেবায়ও অনন্য অবদান রেখেছেন রফিক উল হক। ঢাকা শিশু হাসপাতাল প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখা ছাড়াও বারডেম হাসপাতালে মাইক্রোবায়োলজি বিভাগ ও নূরজাহান ওয়ার্ড, আহসানিয়া মিশন ক্যান্সার হাসপাতাল ও আদ-দ্বীন হাসপাতালের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। সবশেষ গাজীপুরের কালিয়াকৈরে ১০০ বেডের হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেন। ২৫টিরও বেশি সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তিনি সরাসরি জড়িত ছিলেন। ব্যারিস্টার রফিক-উল হক তাঁর জীবনের উপার্জিত অর্থের প্রায় সবই ব্যয় করেছেন মানুষের কল্যাণ ও সমাজসেবায়। আর তার এই উদ্যোগকে বিরল বলে অ্যাখ্যায়িত করেছেন আইন অঙ্গনে তার সমসাময়িকরা। আহাম্মেদ সরোয়ার, বাংলাভিশন, ঢাকা।

You may also like

গোল্ডেন মনিরের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি এলাকাবাসির

গোল্ডেন মনিরের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও তার বাবার নামে