করোনায় ২০২০ সালটিতে বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গন ছিলো স্থবির ও শোকের

করোনায় ২০২০ সালটিতে বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গন ছিলো স্থবির ও শোকের। দর্শকশূণ্য গ্যালারিতে ফুটবল-ক্রিকেটসহ অন্যান্য খেলাতেও আর্থিক ক্ষতির পরিমান পাহাড়সম। এই বছর হয়নি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ। হয়নি এশিয়া কাপ ক্রিকেট। তারপরও অনেক নতুন ঘটনা ও সাফল্যে বিশ্ব এবং দেশের ক্রীড়াঙ্গন আলোড়িত হয়েছে। বাংলাদেশ ক্রিকেটের জন্য বছরটি স্মরণী হয়ে রয়েছে অনূর্ধ্ব ১৯ বিশ্বকাপ জয়ে।  আরো জানাচ্ছেন সাইফুর রহমান চৌধুরী

 

১. ক্রিকেটে বাংলাদেশের জন্য বছরটি শুরু দারুণ সাফল্য দিয়ে। অনূর্ধ্ব ১৯ বিশ্বকাপে প্রথমবার চ্যাম্পিয়ন হয়ে বাংলাদেশ ক্রিকেটে স্মরনীয় অধ্যায় রচনা করেন আকবর আলী, পারভেজ ইমন, তামজিদ হাসান, মাহমুদুল, রকিবুলরা। কোয়াটার ফাইনালে স্বাগতিক দক্ষিণ আফ্রিকা এবং সেমিফাইনালে নিউজিল্যান্ডকে হারিয়ে প্রথমবার ফাইনালে ওঠে বাংলাদেশ। ফাইনালে বৃষ্টি আইনে ভারতের বিপক্ষে ৩ উইকেটের জয়, বাংলাদেশ ক্রিকেটে আত্নবিশ্বাস ফিরিয়ে আনেন জুনিয়র টাইগাররা।

৩. ঘরোয়া ক্রিকেটে বছর শুরু বিপিএল টি-টোয়েন্টি দিয়ে। ফাইনালে খুলনা টাইগার্সকে ২১ রানে হারিয়ে প্রথমবার শিরোপার উল্লাসে মেতে ওঠে আন্দ্রে রাসেলের রাজশাহী রয়্যালস।

৪. তবে করোনায় এ বছর বিপিএল ও প্রিমিয়ার লিগ আয়োজন সম্ভব না হলেও, বিদেশী ক্রিকেটার ছাড়াই বিসিবি প্রেসিডেন্ট কাপ এবং বঙ্গবন্ধু টি-টোয়েন্টি কাপ আয়োজনে সফল বিসিবি। বঙ্গবন্ধু টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে ৫ দলের লড়াইয়ে উত্তেজনাপূর্ণ ফাইনালে গাজী গ্রুপ চট্টগ্রামকে ৫ রানে হারিয়ে, শিরোপা জয় করে মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ, মাশরাফির জেমকন খুলনা।

৫. এই টুর্নামেন্ট দিয়েই আইসিসি নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে এক বছর পর ক্রিকেটে ফেরেন সাকিব আল হাসান। তবে শশুরের মৃত্যুতে খুলনার হয়ে ফাইনালে খেলা হয়নি তার। ব্যাটিংয়ে ভালো করতে না পারলেও, টাইট বোলিং করে খুলনার সাফল্যে অবদান রেখেছেন সাকিব।

৬. করোনা জেকে বসার আগে দেশের মাটিতে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে একমাত্র টেস্ট, ইনিংস ব্যবধানে জিতলেও, পাকিস্তানের কাছে রাওয়ালপিন্ডি টেস্ট ইনিংস ব্যবধানে বিধ্বস্ত হয়ে, লংগার ভার্সনে ব্যর্থতা প্রকট করে তোলে টাইগাররা। টি-টোয়েন্টিতে পাকিস্তানের কাছে সিরিজ হারলেও; ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টিতে জিম্বাবুয়েকে হোয়াটওয়াশ করে দুধের স্বাদ ঘোলে মিটিয়েছে বাংলাদেশ।

৭. জুলাইয়ে ইংল্যান্ড-ওয়েস্ট ইন্ডিজ সিরিজ দিয়ে করোনা সংকট কাটিয়ে আন্তার্জাতিক ক্রিকেট শুরু হলেও; অ্যাডিলেডে দিবা রাত্রির টেস্টে ভারতের ৩৬ রানে অলআউট এ বছর ক্রিকেটে সবচেয়ে বিপর্যস্ত ঘটনা। প্রথম ফাস্ট বোলার হিসেবে টেস্টে জিমি এন্ডারসনের ৬০০ উইকেটের ল্যান্ডমার্ক করোনার মাঝেও ব্যক্তিগত অর্জনকে সমৃদ্ধ করেছে।
ফুটবল:

১. দেশের ফুটবলে করোনা জেকে বসার আগে বছর শুরু বঙ্গবন্ধু গোল্ড কাপ দিয়ে। সেখানে চ্যাম্পিয়ন ফিলিস্তিন ও রার্নাসআপ বুরুন্ডি। স্বাগতিক বাংলাদেশ সেমিফাইনালে উঠলেও, বুরুন্ডির কাছে হেরে বিদায় নেয়।

২.ঘরোয়া ফুটবলে ফেডারেশন কাপে ফাইনালে রহমতগঞ্জকে হারিয়ে টুনামেন্টে চ্যাম্পিয়ন হয় বসুন্ধরা কিংস। তবে করোনার থাবায় থেমে যায় প্রিমিয়ার লিগ।

((৩. যদিও বছরের শেষে করোনাকে জয় করেই শেষ হয় নারী ফুটবল লিগ। সেখানে জাতীয় দল নিয়ে গড়া বসুন্ধরা কিংস অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হয়ে শ্রেষ্ঠত্ব তুলে ধরে। দলের অধিনায়ক সাবিনা খাতুন ৮টি হ্যাটট্রিক সহ লিগে ৩৫ গোল, নারী ফুটবল ইতিহাসে অনন্য এক রেকর্ড গড়েন দেশ সেরা এই তারকা।
))
৪. করোনা সংকট কাটিয়ে নেপালের বিপক্ষে আন্তজাতিক ফুটবলে দুই ম্যাচে একটি জয় এবং অপরটিতে ড্র করে বাংলাদেশ। তবে বড় হতাশার ছিলো বিশ্বকাপ বাছাই পর্বে এশিয়ান চ্যাম্পিয়ন কাতারের কাছে ৫-০ গোলে বিধ্বস্ত হওয়া। এই পরাজয়ে ফুটবল উন্নয়ণের কোন চিত্রই তুলে ধরতে পারেনি জেমি ডে’র দল।

৫.বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন নির্বাচন নিয়ে জল ঘোলা কম হয়নি। অনেক বির্তকের পর বাদল রায়কে হারিয়ে চতুর্থ মেয়াদে সভাপতির ক্ষমতা ধরে রাখেন কাজী সালাউদ্দিন। ((২১ জনের ইসি কমিটিতে তার প্যানেল থেকেই নির্বাচিত হয়েছেন ১৫ জন।))

৬.আন্তর্জাতিক ক্লাব ফুটবলে বার্য়ান মিউনিখের ট্রেবল জয় সবচেয়ে বড় ঘটনা। সেমিফাইনালে বার্সেলোনাকে ৮-২ গোলে উড়িয়ে এবং ফাইনালে পিএসজিকে ১-০ গোলে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ান্স হয় বার্য়ান। ৪৭ ম্যাচে ৫৫ গোল, দলের এই সাফল্যে দূর্দান্ত পারফরম্যান্স রবার্টো লেভানডফস্কির। করোনার কারনে ব্যালন ডি অর না পেলেও, রোনালদো ও মেসিকে হারিয়ে ফিফা বর্ষ সেরা হতে কোন সমস্যা হয়নি লেভানডফস্কির।

৭. তবে বছরে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় ছিলো লিওনেল মেসির দলবদল ইস্যু। শেষ পর্যন্ত ক্লাবকে সম্মান জানিয়ে মেসি বার্সেলোনায় থেকে গেলেও, এই নিয়ে বির্তকে পদত্যাগে বাধ্য হন সভাপতি মারিও বার্তেমেউ। যদিও হতাশার বছরে ব্রাজিল লিজেন্ড পেলের সান্টোসের হয়ে ৬৪৩ গোলের রেকর্ড ভেঙ্গে ৬৪৪ গোল; একটি ক্লাবের হয়ে সর্বোচ্চ লক্ষ্যভেদের রেকর্ড গড়েছেন বার্সেলোনার মেসি।

৮. ইংলিশ প্রিমিয়ার ফুটবলে তিন দশক পর চ্যাম্পিয়ন হয়ে করোনাকে জয় করেছে ইয়ুর্গন ক্লপের লিভারপুল।

শোক:
এ বছর বিশ্বক্রীড়াঙ্গন হারিয়েছে কিংবদন্তী তুল্য কয়েকজন ক্রীড়াবিদকে। তবে সব মৃত্যুকে ছাপিয়ে বড় হয়ে ওঠে দিয়েগো ম্যারাডোনার বিদায়। ২৫ নভেম্বর ক্রীড়াঙ্গনের সবচেয়ে বনার্ঢ্য চরিত্র ম্যারাডোনার মৃত্যুতে পুরো পৃথিবীই যেন শোকে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলো। হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ৬০ বছর বয়সে পৃথিবী ছেড়ে যান সর্বকালের অন্যতম সেরা এই ফুটবলার। এই গ্রেটের মৃত্যুতে পৃথিবীজুড়ে এখনো পড়ছে দীঘশ্বাস।
এই বছর আমরা হারিয়েছি বাস্কেটবল লিজেন্ড কোবি ব্রায়ান্ট, ইতালির ১৯৮২’র বিশ্বকাপ জয়ের নায়ক পাওলো রসি’কে।

দেশের ফুটবল হারিয়েছে কিংবদন্তী বাদল রায়’কে। ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু বরন করেন বাদল রায়। ক্রীড়াঙ্গনে বাংলাদেশ আরো হারিয়েছে স্বাধীন বাংলা দলের নওশেরুজ্জামান, আবাহনীর গোলাম রব্বানী হেলাল, মোহামেডানের নুরুল হক মানিক ও বিজেএমসির এস এম সালাউদ্দিনসহ হকির সাবেক তারকা এহতেশাম সুলতানকে।
জুনে করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরন করেন ঢাকার সাবেক মেয়র প্রয়াত সাদেক হোসেন খোকার একমাত্র ছোট ভাই, ব্রাদার্স ইউনিয়ন ক্লাবের সাবেক সাধারন সম্পাদক এবং বাফুফের যুগ্ম সম্পাদক আনোয়ার হোসেন উজ্জ্বল।

বিশ্ব ক্রিকেট এই বছর হারিয়েছে ক্যারিবিয় গ্রেট স্যার এভারটন উইকস, ভারতের সাবেক ওপেনার চেতন চৌহান ও অস্ট্রেলীয়ার ডিন জোনসসহ আরো অনেককেই।

 

You may also like

২০২০ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন ৬৬৮৬ জন : যাত্রী কল্যাণ সমিতি

গত বছর সারাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন ৬